২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজাবাসীদের ওপর ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা চালাচ্ছে একমাত্র ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েল। মানবতাবিরোধী ইতিহাসের সর্বোচ্চ লঙ্ঘন দেখা গেছে দখলকৃত ও অবরুদ্ধ অঞ্চলটিতে। তবে সম্প্রতি বৈশ্বিক পরাশক্তিরা একে একে স্বীকৃতি দিচ্ছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে।
এর মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি বড় অংশ এখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সোমবার নিউইয়র্কে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা এবং আরও কয়েকটি দেশ প্রায় দুই বছরের গাজা যুদ্ধের পর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
এই স্বীকৃতি দেওয়ার গুরুত্ব কতটুকু? কোন কোন দেশ এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে? এখানে রাষ্ট্রটির কূটনৈতিক স্বীকৃতির একটি সংক্ষিপ্তসার দেওয়া হলো—
রাষ্ট্রটি যে ভূখণ্ড দাবি করে, তার মধ্যে বর্তমানে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করে আছে এবং গাজা উপত্যকা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের সদস্যদের প্রায় ৮০ শতাংশ দেশ এখন পর্যন্ত স্বীকৃতি দিয়েছে।
এএফপি’র প্রতিবেদন অনুয়ায়ী জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের মধ্যে অন্তত ১৫১টি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে তিনটি আফ্রিকান দেশের কাছ থেকে কোনো নিশ্চিত তথ্য পায়নি সংবাদ সংস্থাটি।
ছয়টি ইউরোপীয় দেশ—ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, অ্যান্ডোরা এবং মোনাকো—সোমবার জাতিসংঘে তাদের স্বীকৃতি ঘোষণা করে এই তালিকায় নাম লিখিয়েছে। এর একদিন আগে প্রথম জি-৭ দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য ও কানাডা স্বীকৃতি দেয়। তাদের পরপই অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগালও স্বীকৃতি দেয়।
রাশিয়া, সমস্ত আরব দেশ, প্রায় সব আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্র এবং অধিকাংশ এশীয় দেশ—যেমন ভারত ও চীন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান—ইতিমধ্যেই তালিকায় রয়েছে।
আলজেরিয়া ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর, পিএলও’র নেতা ইয়াসির আরাফাতের একতরফা স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার কয়েক মিনিট পর, প্রথম দেশ হিসেবে ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ও মাসে আরও অনেক দেশ স্বীকৃতি দেয়। ২০১০ সালের শেষ ভাগ ও ২০১১ সালের শুরুতে আরেকটি স্বীকৃতির ঢেউ আসে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর ইসরায়েলের গাজা আক্রমণ ও ভয়াবহতা দেখে আরও ১৯টি দেশকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তবে এখনো অন্তত ৩৯টি দেশ—ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা এখনো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়নি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার সম্পূর্ণভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা প্রত্যাখ্যান করে।
এশীয় দেশগুলোর মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুর ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়নি। আফ্রিকার ক্যামেরুন, লাতিন আমেরিকার পানামা এবং ওশেনিয়ার বেশিরভাগ দেশও স্বীকৃতি দেয়নি।
কিছুদিন আগ পর্যন্ত ইউরোপ ছিল এই বিষয়ে সবচেয়ে বিভক্ত মহাদেশ। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কেবল তুরস্ক ও সাবেক সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সাবেক পূর্ব ব্লকের কিছু দেশ, যেমন হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্র, এখনও দ্বিপাক্ষিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।
পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে একত্রে স্বীকৃতি না দেওয়ার অবস্থানে ছিল, শুধু সুইডেন ব্যতিক্রম, যারা ২০১৪ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু গাজার যুদ্ধ পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে। ২০২৪ সালে নরওয়ে, স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও স্লোভেনিয়া সুইডেনের পথই অনুসরণ করে। সম্প্রতি এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি দেশ।
তবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই ইতালি ও জার্মানির।
ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় এক্স-মার্সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক রোমাঁ লে বোফ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর একটি’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এটি রাজনীতি ও আইন—দুটির মাঝামাঝি একধরনের অর্ধেক পথ। রাষ্ট্রগুলো স্বীকৃতির সময় ও ধরন বেছে নিতে স্বাধীন। এর মধ্যে ব্যাপক ভিন্নতা রয়েছে।
