গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার একটি বিদ্যালয়ে মাঠে ধান চাষ করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার মাঠ সংকুচিত হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ও শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রধান শিক্ষক তার ব্যক্তিগত স্বার্থে মাঠটি স্থানীয় প্রভাবশালীর কাছে দিয়েছেন। সম্প্রতি বিদ্যালয় মাঠে ধান চাষের ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। তবে উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফেসবুকে বিদ্যালয়ের মাঠে ধান চাষের ভাইরাল ছবিটি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রামদেব দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের। বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের খেলার মাঠে চলতি আমন মৌসুমের ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে। চারপাশে প্রাচীর রয়েছে। প্রাচীর মধ্যে বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের মাঠে ধানের আবাদ।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৬ সালে উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের রামদেব গ্রামে ১৫০ শতক জমির ওপর গড়ে উঠে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় চারশো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে রয়েছেন শফিকুল ইসলাম।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, বিদ্যালয় মাঠে ধান চাষের দৃশ্য। টিফিনের সময় শিক্ষার্থীরা শ্রেণি কক্ষে বসে আছে। কেউ বারান্দায় হাটা চলা করছে। শিক্ষকরা বসে নানা গল্প করছেন। একপাশে টিনসেড ওয়াল ও একটি নতুন একতলা ভবন। ভবনে চলে পাঠদান। সেই ভবনের সামনে সাড়ে তিন বিঘার একটি খেলার মাঠ। সেই মাঠে শিক্ষার্থীরা এক সময় খেলাধুলা করত। তবে পুরা মাঠে এখন ধান চাষ করায় খেলা বন্ধ রয়েছে। ধানের জমি ঘেঁষে স্কুল ভবন। শ্রেণি কক্ষের দরজা খুললেই ধানের চারা দেখা যায়। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাদের দাবি, কয়েক বছর আগে এই মাঠে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় কিশোররা ফুটবলসহ নানা খেলা খেলত। কিন্তু এখন সেই খেলা হয় না। তাদের অভিযোগ, ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বসুনিয়া স্থানীয় প্রভাবশালী শাহীন মিয়ার কাছে বিদ্যালয়ের মাঠটি বন্ধক দিয়েছেন। ফলে বছরের পর বছর ধরে খেলাধুলা বন্ধ রয়েছে। সব শিক্ষার্থীরা বিরতির সময় শ্রেণিকক্ষ বা বারান্দাতেই সময় কাটাচ্ছে। খেলার মাঠ স্বল্পতার ফলে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। তাদের দাবি, মাঠটি পুনরুদ্ধার করে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ও শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করবে কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়রা আরও জানায়, ২০০৯ সালে রামদেব দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেন শফিকুল ইসলাম। যোগদানের পর থেকে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিয়মিত স্কুল ফাঁকি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আত্মীয়কে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বানিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনায় মনগড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শতবর্ষী গাছ বিক্রি, মাঠে থাকা পোস্ট অফিস উচ্ছেদ, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে অর্থ লেনদেনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ নাই। তারা ইন্টারনেটে গেমস, টিফিনের সময়টুকু বসে পার করছে। খেলাধুলা না করলে ছেলে-মেয়েদের শারীরিক এবং মানসিক নানা সমস্যার আশঙ্কা করছেন অভিভাবকরা। শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তারা।
কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, স্কুল মাঠে ধান চাষ হয়েছে। স্কুলে আসতে গিয়ে ধানের আইল দিয়ে আসতে হয়। আমাদের বিদ্যালয়ে অদ্ভুত এক শিক্ষার পরিবেশ। আমরা খেলাধুলা করতে পারছি না।
এদিকে, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী মাঠ উন্মুক্ত ও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন। তাদের দাবি, শিশুদের খেলার মাঠ অবিলম্বে ফিরিয়ে দিতে হবে। এসব বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া সত্বেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা এলাকায় ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
সাবেক শিক্ষার্থী ও ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি স্বীকার করে বলেন, জমিটি ১ লাখ টাকা বন্ধ রেখে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে ওই জমিতে ধান চাষ হচ্ছে। ধান চাষ করা জমির পাশে ২০১৫ সালে একটি একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। স্কুলের আগে সীমানা প্রাচীর ছিল না। প্রাচীর দেওয়ায় কারণে ধানের জায়গাটি দৃষ্টিকটুর হচ্ছে। প্রাচীরের কাজ শেষ হলে, জায়গাটিতে মাটি কেটে ভরাট করে খেলার মাঠ করার পরিকল্পনা আছে। তবে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক।
এ বিষয়ে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আতাউর রহমান জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ে যে জায়গাটিতে ধান চাষ করা হয়েছে, সেটি আসলে শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ ছিল। বিদ্যালয় মাঠে এভাবে ধান চাষ ঠিক না। এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই তারা মাঠ ও বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকার মানুষ মৌখিক ও লিখিতভাবে বক্তব্য দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে এই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজ কুমার বিশ্বাস বলেন, বিদ্যালয় মাঠে ধান চাষের সুযোগ নেই। তদন্ত চলছে। প্রতিবেদন হাতে আসলে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে
যেসব দেশে পিআর পদ্ধতি আছে সেখানে বিতর্কিত: ডা. রফিক
কসোভোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টার
খিলক্ষেত ফুটওভার ব্রিজে পুলিশের অ্যাকশন, আটক ৭ হকার 