লাদাখে জেন-জি বিক্ষোভের ‘ট্রেলার’ দেখল ভারত!

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:০১ এএম

লাদাখে এখন হাড়-কাঁপানো শীত। হিমালয়ের সাড়ে ১১ হাজার ফিট উচ্চতায় ছিমছাম ছোট শহরে এখন বিক্ষোভের আগুন জ্বলছে। আলাদা রাজ্যের মর্যাদা ও বিশেষ সংবিধানিক সুরক্ষার দাবিতে তরুণরা ফেটে পড়েছেন বিক্ষোভে। আগুন দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির স্থানীয় কার্যালয়ে। সংঘর্ষে নিহত হয়েছে চারজন।

লাদাখের মানুষ দাবি আদায়ে ছয় বছর ধরে শান্তিপূর্ণ মিছিল ও অনশনের মতো আন্দোলন চালাচ্ছিল। কিন্তু সেই আন্দোলন হঠাৎ সহিংস রূপ নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে এর পেছনের কারণ কী? কেন তরুণ প্রজন্ম এতটা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল? লাদাখে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সহিংস রূপ নেওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণের কথা জানিয়েছে আলজাজিরা।

আন্দোলনের অংশ হিসেবে ‘লাদাখ অ্যাপেক্স বডি’র (বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠনের জোট) নেতৃত্বে চলছিল অনশন কর্মসূচি। গত বুধবার এই অনশন ১৫তম দিনে গড়ায়। এর আগের দিন সন্ধ্যায় দুজন বর্ষীয়ান অনশনকারী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় আন্দোলনের সংগঠকরা ধর্মঘটের ডাক দেন, যা পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে। এর পাশাপাশি, মোদি সরকারের সঙ্গে আলোচনা বিলম্বিত হওয়ায় বিক্ষোভকারীদের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ কাজ করছিল।

লেহ শহর প্রশাসনের সর্বোচ্চ কমিটির প্রধান থুপস্তান সাং বলেন, ‘দাবি আদায় করতে গিয়ে আমাদের কয়েকজন তরুণ প্রাণ দিয়েছেন... আমি লাদাখের জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই, তরুণদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেব না... দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

নরেন্দ্র মোদি সরকার ২০১৯ সালে লাদাখকে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে পৃথক করে সরাসরি নয়াদিল্লির অধীনে নিয়ে গেলে বৌদ্ধ-মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলটি স্বায়ত্তশাসন হারায়।

স্থানীয় নেতা সোনম ওয়াংচুকের নেতৃত্বে আন্দোলনকারীদের দাবি, লাদাখকে বিশেষ মর্যাদা দিতে হবে যেন নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার গঠনের সুযোগ থাকে। তিনি বলেন, জ্যেষ্ঠ নেতাদের অসুস্থ হয়ে পড়া এবং সরকারের গড়িমসির কারণে তরুণদের মধ্যে এ ধারণা জন্মায় যে, শান্তিপূর্ণ পথে আর কাজ হচ্ছে না। এরপরই তরুণদের বিভিন্ন গোষ্ঠী লেহ শহরের মূল প্রতিবাদস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সরকারি ভবন ও বিজেপির কার্যালয়ের দিকে সেøাগান দিতে দিতে এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ বেধে যায়। বিক্ষোভকারীরা বিজেপির কার্যালয়সহ বেশ কয়েকটি ভবন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।

পুলিশের বরাতে রয়টার্স জানায়, সহিংসতায় ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তত ২০ জন পুলিশ সদস্য। লাদাখের লেফটেন্যান্ট গভর্নর কবিন্দর গুপ্ত এক ভিডিও বার্তায় সহিংসতা বন্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

চীনের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্তের একটি কৌশলগত এলাকা লাদাখ। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৩ সাল থেকে লাদাখের নেতাদের সঙ্গে দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করছে। আগামী ৬ অক্টোবর আলোচনার পরবর্তী বৈঠক হওয়ার কথা।

এদিকে সোনম ওয়াংচুক এ ঘটনাকে ‘তরুণদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ’ ও ‘জেন-জি বিপ্লব’ বলে অভিহিত করেছেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে আস্থা হারিয়ে তরুণরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এসেছে। তিনি সাম্প্রতিককালে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে একে তুলনা করেন।

লাদাখের এ সংকট ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ভূরাজনৈতিকভাবে এটি চীন সীমান্তের একটি স্পর্শকাতর অঞ্চল, অন্যদিকে একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সহিংস রূপ নেওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হলো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত