বিশ্ব জুড়ে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ পরিবর্তনের ডাক

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:১৪ এএম

বর্তমানে তরুণ সমাজ সূর্যের আলোর মতো দীপ্তি ছড়াচ্ছে, কাটাচ্ছে দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচারের কালো অধ্যায়। তরুণ সমাজে জাগরণ হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ও নেপালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রজন্মের ক্ষোভ, স্বপ্ন ও সাহস ইতিহাসকে নতুন পথে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে আন্দোলন শুরু হয়। মূলত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামে। প্রথমে শান্তিপূর্ণ হলেও পুলিশের দমননীতি, ছাত্রদের ওপর হামলা এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ আন্দোলনকে তীব্র করে। শেষ পর্যন্ত একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে, নেপালে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের মাধ্যমে সংকট শুরু হয়। তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে জেনারেশন জেড প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। পুলিশের গুলি, টিয়ার গ্যাস আর কঠোর দমননীতিতেও তারা পিছু হটেনি। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী কাঠমান্ডুসহ সারা দেশে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগে বাধ্য হন।

বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলন দুই দেশেই তরুণ সমাজের চেতনার শক্তি নতুন করে প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশে দেখা যায়, কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হলেও একসময় আন্দোলন রূপ নেয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে। শিক্ষার্থীদের একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা সাধারণ মানুষকে আবেগাপ্লুত করে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও সোশ্যাল মিডিয়ার বিকল্প ব্যবহার ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রচার আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেয়। নেপালেও সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা, আন্দোলনের জন্ম দেয়। বর্তমান প্রজন্ম, যাদের জীবনের বড় অংশ ডিজিটাল যোগাযোগের সঙ্গে জড়িত, তাদের কাছে এটি ছিল স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। ১৯ জনের সেই মৃত্যু আন্দোলনকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। পুড়তে থাকে সরকারি ভবন, সংসদ ভবন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর পড়ে কাঠমান্ডুর দিকে। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন তরুণদের বৈধ দাবি উপেক্ষা করে কিংবা দমন করে, তখনই আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত সরকার পতন হয়।

তরুণদের এমন জাগরণের পেছনে কিছু কারণ কাজ করেছে। যার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে অন্যায়ের প্রতিরোধ। বাংলাদেশের কোটা আন্দোলন কিংবা নেপালের সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা দুটিই তরুণদের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। অভিব্যক্তির স্বাধীনতা সবার ন্যায্য অধিকার। তরুণ সমাজ নিজেদের কথা বলার সুযোগ চায়। যখন সেই স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়, তখন তাদের প্রতিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। ডিজিটাল যুগের শক্তি সবার জন্য এখন নিত্যপ্রয়োজনীয়। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর যুগে ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। আন্দোলন সংগঠিত এবং সচেতনতা ছড়াতে এটি প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে। লম্বা সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতৃত্বের একঘেয়েমি ও দুর্নীতির অভিযোগও তরুণদের ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে। তরুণ সমাজ এখন শুধুই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, তারা চাচ্ছে অংশগ্রহণ, দায়বদ্ধতা এবং স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা। রাষ্ট্র যদি তাদের শক্তিকে স্বীকৃতি দেয় এবং সঠিকভাবে পরিচালনা করে, তবে তরুণ সমাজকে ধ্বংসাত্মক না করে গঠনমূলক পথে ব্যবহার করা সম্ভব। এই জাগরণকে রাষ্ট্রের শক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে হলে, কিছু মৌলিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। আসলে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির সুযোগ তৈরি, তরুণ নেতৃত্বকে গুরুত্ব, মুক্ত ও সুষ্ঠু অভিব্যক্তি নিশ্চিত, ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ না করে তাদের দাবিকে গ্রহণযোগ্য, শিক্ষার্থী ও যুবকদের জন্য ন্যায্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি মূলত এ সবই আসল ভিত্তি। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিলে তরুণদের ইতিবাচক শক্তি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তরুণরা আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করতে হলে, তরুণ সমাজের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বর্তমানে তরুণরা নিজস্ব অধিকার কড়ায়-গ-ায় বুঝে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছে।

বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তরুণ সমাজ আর কেবল দর্শক নয়, বরং তারা সক্রিয় ইতিহাস নির্মাতা। তাদের শক্তি অবহেলা করলে, রাষ্ট্র টিকতে পারবে না। ইতিহাস সাক্ষী, তরুণদের নেতৃত্বেই যে কোনো সমাজে বড় পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে, সাম্প্রতিক কোটা আন্দোলন কিংবা নেপালের গণআন্দোলন সব ক্ষেত্রে তরুণরাই ছিল চালিকাশক্তি। তবে এটিও সত্য, আন্দোলন কেবল সরকার পতন ঘটানোর জন্য নয়, বরং একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য হওয়া উচিত। সরকার পতন হয়তো তাৎক্ষণিক সমাধান এনে দেয়, কিন্তু বিকল্প কাঠামো গড়ে না উঠলে, নতুন সরকারও ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে পারে। সুতরাং তরুণদের দায়িত্ব কেবল প্রতিবাদ নয়, বরং একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা। যেখানে থাকবে কোন ধরনের রাষ্ট্র ও সমাজ তারা গড়তে চায়, তা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা। তরুণ সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে। কেবল ক্ষোভ প্রকাশ নয়, বরং নিজেদের মধ্যে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও ইতিবাচক চিন্তা গড়ে তুলতে হবে। অহিংস পদ্ধতিতে, যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে দাবি প্রতিষ্ঠা করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের শক্তিকে দমিয়ে না রেখে, রাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। দমননীতি কখনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না। সংলাপ, অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহির মাধ্যমে রাষ্ট্র যদি তরুণদের পাশে দাঁড়ায়, তবে ভবিষ্যৎ হবে আরও আলোকিত। একটি দক্ষ, কর্মমুখী এবং উদ্ভাবনী তরুণ প্রজন্মই কেবল রাষ্ট্রকে দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে পারে। তরুণদের শক্তি যদি গঠনমূলক পথে পরিচালিত করা যায়, তবে রাষ্ট্র একটি নতুন দিগন্তে পৌঁছাতে পারবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত