ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ভর্তি হওয়া অনেক রোগীর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৫৫৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৮ জনে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসেই ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ৩৯ শতাংশই ঘটেছে সেপ্টেম্বরে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম ডেঙ্গু জ্বরের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। কন্ট্রোল রুম ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি ৫৯টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে আগস্টে ৩৯ জন, জুলাইয়ে ৪১ জন, জুনে ১৯ জন, মে মাসে ৩ জন, এপ্রিলে ৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন এবং জানুয়ারিতে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে মার্চ মাসে কোনো মৃত্যু রেকর্ড হয়নি। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত ১৯৮ জনের মধ্যে ১০১ জনের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, যারা যুবক হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ, ডেঙ্গুতে যুবকরাই বেশি মারা যাচ্ছেন। ডেঙ্গুর মৌসুম এখনো শেষ না হওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আগামী দিনগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রকার: ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। একজন ব্যক্তি এই চারটি ভাইরাসের কারণে চারবার আক্রান্ত হতে পারেন। প্রথমবার আক্রান্ত হলে সাধারণত তা গুরুতর হয় না। কিন্তু দ্বিতীয় বা পরবর্তী আক্রান্ত হলে রোগটি গুরুতর হতে পারে, যা ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে রূপ নিয়ে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হলে বিশেষ সতর্কতা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, একজন ব্যক্তি চারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। প্রথমবার আক্রান্ত হলে তা সাধারণত গুরুতর হয় না। কিন্তু দ্বিতীয় বা পরবর্তী বার আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই জ্বর হলেই সতর্ক হতে হবে, নইলে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়বে। তিনি আরও বলেন, চলতি বছর যুবক ও কর্মক্ষম ব্যক্তিরা বেশি মারা যাচ্ছেন। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ডেঙ্গু মশা সাধারণত ভোরে ও সন্ধ্যায় বেশি কামড়ায়। কর্মক্ষম মানুষ এই সময়ে বাসা, কর্মস্থল বা যাতায়াতের পথে মশার কামড়ের শিকার হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে যুবকদের বেশি মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমাতে গবেষণার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৫৫৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৭,৩৪২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে ৪৪,৭৯৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৬০.৬০ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৯.৪০ শতাংশ মহিলা।
