অচলাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:১১ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার আবারও আংশিক শাটডাউনের মুখোমুখি হয়েছে। নতুন অর্থবছরের শুরুতে, অর্থাৎ ১ অক্টোবর ২০২৫ এর আগে সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত বিলটি সিনেটে পাস না হওয়ায় স্থানীয় সময়  গত মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে সরকারি তহবিল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জরুরি সেবা ব্যতীত অন্যান্য সরকারি কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে। বিবিসি জানাচ্ছে, বিল পাসের জন্য প্রয়োজনীয় ৬০টি ভোট দরকার ছিল। কিন্তু ৫৫-৪৫ ভোটে বিলটি প্রত্যাখ্যাত হয়।

১৯৮০ সাল থেকে এ নিয়ে ১৫ বার শাটডাউনের কবলে পড়ল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। যার মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ছিল ২০১৮-১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। সে সময় ৩৫ দিনের অচলাবস্থায় চাপে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

এ অচলাবস্থা সৃষ্টির জন্য অবশ্য রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা পরস্পরকে দূষছেন। বিবিসি, আলজাজিরাসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, মার্কিন সিনেটে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বাজেট বিল নিয়ে তীব্র মতবিরোধের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রিত সিনেটে ৫৩টি আসন থাকলেও, তারা ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ছাড়া বিলটি পাস করতে পারেনি। এর পাশাপাশি, ডেমোক্র্যাটরা স্বাস্থ্যসেবা খাতে অতিরিক্ত এক ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দের দাবি নিয়ে আরেকটি বিল উত্থাপন করেছিল, যা ৪৭-৫৩ ভোটে খারিজ হয়।

রিপাবলিকান নেতা জন থুন ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা করে বলেছেন, তারা ‘বামপন্থি রাজনৈতিক ঘাঁটি সন্তুষ্ট করতে’ এই পথ বেছে নিয়েছে। অপরদিকে, ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার রিপাবলিকানদের স্বাস্থ্যসেবা সংকট সমাধানে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেছেন।

এই শাটডাউনের ফলে জরুরি নয় এমন সরকারি কার্যক্রম, যেমন অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ঋণ অনুমোদন ইত্যাদি বন্ধ রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তা, সামরিক বাহিনী এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের মতো জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের কাজ অব্যাহত থাকবে, যদিও তাদের বেতন বকেয়া থাকবে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও খাদ্য সহায়তার মতো কিছু সেবা চলমান থাকলেও, অপ্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচিত কর্মীদের বেতনহীন ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ফেসবুক পোস্টেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। তারা বলেছে, জরুরি নিরাপত্তা তথ্য ব্যতীত তাদের অ্যাকাউন্ট নিয়মিত আপডেট করা হবে না, তবে পাসপোর্ট ও ভিসা সেবা অব্যাহত থাকবে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই শাটডাউনকে সরকারি খাতের আকার কমানোর সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তিনি হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের বলেছেন, এই সময়ে তিনি এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন যা ডেমোক্র্যাটদের জন্য ‘ক্ষতিকর’ হবে, যেমন ব্যাপক ছাঁটাই এবং তাদের পছন্দের কর্মসূচি কাটছাঁট।

অফিস অব বাজেট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টকে তিনি ইতিমধ্যে জনবল হ্রাসের পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮-১৯ সালে ৩৫ দিনের শাটডাউনের সময়ও তিনি এমন পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন। এবারও তিনি ‘অপরিবর্তনযোগ্য’ ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন, যা ফেডারেলকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

হোয়াইট হাউজ তাদের ওয়েবসাইটে শাটডাউনের কাউন্টডাউন ঘড়ি চালু করেছে, যেখানে ‘ডেমোক্র্যাট শাটডাউন’ শব্দটি ব্যবহার করে দায় ডেমোক্র্যাটদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে, রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের উভয় কক্ষেও বিল পাসে প্রয়োজনীয় সমঝোতা না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। গত মাসে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে রিপাবলিকানরা ২০ নভেম্বর পর্যন্ত তহবিল সচল রাখার একটি স্বল্পমেয়াদি বিল পাস করলেও, সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা তা প্রত্যাখ্যান করে। ডেমোক্র্যাটরা স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানালেও রিপাবলিকানরা তাতে সম্মত হয়নি।

ঐতিহাসিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রে শাটডাউন সাধারণত এক থেকে পাঁচ দিন স্থায়ী হয়, তবে ১৯৯০-এর দশকে এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এর সময়কাল বেড়েছে। রোনাল্ড রিগ্যানের সময়ে আটবার স্বল্পমেয়াদি শাটডাউন ঘটলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রভাব আরও ব্যাপক হয়েছে।

বাইপার্টিজান পলিসি সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, এটি ১৯৮০ সালের পর ১৫তম শাটডাউন।

রিপাবলিকান নেতা জন থুন আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই অচলাবস্থা শিগগিরই কেটে যাবে এবং বুধবারের মধ্যে নতুন বিলে সমঝোতা হবে। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ফেডারেলকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা এবং সরকারি সেবার বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা রয়ে গেছে। এই অচলাবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও জনগণের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত