নিজ ভূমে পরবাসী ফেনীর অর্ধলক্ষাধিক পরিবার, চায় প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:১৫ পিএম

মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে রোহিঙ্গারা আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে এসেছিল বাংলাদেশে। মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে সরকার ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার আবাসন ও জীবন ধারণের ব্যবস্থা করে চলেছে বছরের পর বছর ধরে।  অথচ বংশ পরম্পরায় বসবাস করেও ফেনীর অর্ধ লক্ষাধিক পরিবার নিজভূমে পরবাসী হয়ে আছেন। এ দুর্ভোগ থেকে নিস্তারে আকুতি-মিনতি জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। অনোন্যপায় হয়ে তারা এখন প্রধান উপদেষ্টার সহৃদয় হস্তক্ষেপের আশায় প্রহর গুণছেন।

ভুক্তভোগীদের তথ্যানুযায়ী, সাত দশকের বেশি সময় ধরে নিজ ভূমিতে বাড়িঘর নির্মাণ করে বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসছিলেন হাজার হাজার পরিবার। কেউ কেউ গড়ে তুলেছিলেন দালান-কোঠাও। কিন্তু তারা এখন ভুগছেন অস্তিত্ব সংকটে। বাৎসরিক খাজনার পরিবর্তে তাদের কাছে দাবি করা হচ্ছে মাসিক ভাড়া। এতে করে আতংকগ্রস্ত হয়ে দিনাতিপাত করছেন ফেনী সদর উপজেলার বারাহিপুর, বিরিঞ্চি, সুলতানপুর, ধর্মপুর, হাসপাতাল রোড ও মজলিসপুর এলাকায় বসবাসকারীরা। গত বছর আগস্টে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরই তাদের ওপর যেন আজাব নেমে আসে।

জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ফেনীতে (তদানীন্তন মহকুমা) একটি বিমান বন্দর স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সে কারণে ৩৭৫ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে বিমানবন্দরের রানওয়ের জন্য ৭৫ একর জায়গা নির্ধারণ করে রাখা হয়। তবে যুদ্ধ পরবর্তীতে বিমানবন্দরটি পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে আছে।

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে (২০০৪ সালে) বিমানবন্দরের রানওয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গার একাংশে ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। অন্যদিকে অধিগ্রহণকৃত অন্য ভূমিতে পুরনো মালিকরা স্ব স্ব জায়গায় বাড়িঘর নির্মাণ করে বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসছেন। এর মধ্যে কেউ কেউ সামরিক ভূমি অধিদপ্তর থেকে বছর ওয়ারী লিজ নিয়ে নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করেছেন।

অনেক জমিতে পাকা বহুতল অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। নিজ নামে বিদ্যুৎ সংযোগও নেওয়া হয়েছে প্রতি বাড়িতে। তবে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ের দিকে সেখানে সামরিক বাহিনীর আনাগোনা বেড়ে যায়। তারা সেখানে ক্যাম্প স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। নকশা সাথে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আয়তন অনুযায়ী মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করে সেটি পরিশোধের জন্য বসবাসকারীদের চাপ দিচ্ছেন।

বাড়ি ভেদে ভাড়া ২, ৫, ১০ এমনকি ১৫ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে। ইচ্ছেমাফিক পিলারও স্থাপন করছেন। কোনো কোনো পিলার ঘরের মধ্যে কিংবা দরজার সামনে স্থাপন করা হয়েছে। এমনকি নিজ পুকুরে মাছ ধরা কিংবা নিজ আঙ্গিনায় থাকা গাছ কাটতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। কারো কোনো ওজর আপত্তি শুনতে চাইছেন না।। এমনকি ট্রাস্ট ব্যাংক ফেনী শাখায় 'এয়ারপোর্ট ফান্ড' নামে হিসাব (নং-০০১৫০৩১০২০১৬৫৮) খুলে সেখানে ভাড়ার টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। এতে করে বসবাসকারীদের মধ্যে আতঙ্ক এবং উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে জমি অধিগ্রহণ করা হলেও সে সময়ে কাউকে কোন টাকা পরিশোধ করা হয়নি। যে কারণে যুদ্ধের পর পূর্বতন মালিকরা স্ব-স্ব জমির দখলস্বত্ব বুঝে নেন। তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের এক অফিস আদেশেও বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে।

আওয়ামী সরকারের পতনের পর এ নিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মানববন্ধনসহ প্রতিবাদমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ঘটনার সবিস্তার তুলে ধরতে গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। কর্তৃপক্ষের সাড়া না পাওয়ায় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে গত বছরের নভেম্বরের শেষার্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বরাবর আবেদন দেওয়া হয়েছে। তবে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।

উপায়ান্তর না পেয়ে গত সেপ্টেম্বর মাসে আবারো প্রধান উপদেষ্টা, সেনা প্রধান এবং প্রতিরক্ষা ও ভূমি সচিব বরাবর পৃথক আবেদন দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইনের বিধান অনুযায়ী অধিগ্রহকৃত সম্পত্তি নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট কাজে ব্যবহার না হলে তা পূর্বতন মালিকের কাছে ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু আট দশক পরিত্যক্ত থাকার পরও ফেরত দেওয়ার নামগন্ধ নেই। উপরন্তু ফি বছর খাজনা নেওয়া হয়েছে। সেখানে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইনের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ তুলে ধরা হয়েছে।

উক্ত আইনের 'অধিগ্রহণকৃত স্থাবর সম্পত্তি ব্যবহার' প্রসঙ্গে ১৯ (১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ‘যে উদ্দেশ্যে কোনো স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হইবে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে, উক্ত উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোনোভাবে উক্ত সম্পত্তি ব্যবহার অথবা বিক্রয়, লিজ, এওয়াজ, বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাইবে না।’

একই অনুচ্ছেদের উপধারা (২)-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো প্রত্যাশী ব্যক্তি বা সংস্থা উপধারা (১)-এর বিধানের পরিপন্থীভাবে কোনো অধিগ্রহণকৃত স্থাবর সম্পত্তি ব্যবহার করিলে অথবা যে উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করা হইয়াছে সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করিলে, জেলা প্রশাসক নির্দেশ প্রদান করিলে, তিনি উক্ত সম্পত্তি জেলা প্রশাসকের নিকট সমর্পণ করিতে বাধ্য থাকিবেন।’

উপধারা (৩)-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো প্রত্যাশী ব্যক্তি বা সংস্থা উপধারা (১) বা (২)-এর বিধান লঙ্ঘন করিলে জেলা প্রশাসক কারণ দর্শানোর সুযোগ প্রদান পূর্বক, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি পুন্যগ্রহণ করিবেন এবং সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উহা খাস খতিয়ানভুক্ত করিবেন।’

আবেদনে আরো বলা হয়, ব্রিটিশ আমলেই 'তদানীন্তন নোয়াখালী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অধিগ্রহণকৃত ভূমি ব্যবহার বিষয়ে প্রত্যাশী সংস্থা বরাবর এক অফিস আদেশ জারি করেন। যেখানে উল্লেখ রয়েছে ‘আপনি যদি নির্ধারিত তারিখে উক্ত সম্পত্তির দখল গ্রহণের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হন, তবে আপনার অনুকূলে প্রদত্ত দখল পুনঃপ্রদানের আদেশ বাতিল বলে গণ্য হবে এবং দখল মালিকের নিকট হস্তান্তর করা হবে।’

আবেদনের শেষাংশে দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে অর্ধ লক্ষাধিক পরিবারকে রক্ষায় আশু হস্তক্ষেপ কামনা করে বলা হয়েছে, বর্তমানে যে সমস্যা উদ্ভব হয়েছে, সেটি নিরসন করা কঠিন কোনো কাজ নয়। জেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিসকে সমন্বয় করে যৌথভাবে ভূমি ব্যবহারকারীদের দখলস্বত্ব কিংবা মালিকানার স্বপক্ষে খতিয়ান ও নকশা যাচাই করা যেতে পারে। সেই অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করলে হাজার হাজার পরিবার তাদের স্থায়ী ঠিকানার সন্ধান পেতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত