লিংকডিনে যোগাযোগ পিকো লোপেজের, কেপ ভার্দেকে বিশ্বকাপে নিয়ে বললেন, 'স্বপ্ন সত্যি হয়'

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৫, ১১:৪৬ এএম

মাত্র ৪,০৩৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছোট্ট একটি দ্বীপপুঞ্জ  কেপ ভার্দে। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলীয় দেশ সেনেগালের থেকে প্রায় ৪৬০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরে ছড়িয়ে আছে এই দশটি দ্বীপ ও পাঁচটি ছোট দ্বীপখণ্ড।  জনসংখ্যা ৫ লাখ ২৪ হাজার ৮৭৭ জন। সরকারি ভাষা পর্তুগিজ হলেও, এর বাইরের পৃথিবীতেই বসবাস করে আরও প্রায় ১৫ লাখ কেপ ভার্দিয়ান—যা দেশের মোট জনসংখ্যার তিনগুণ! তারা মূলত পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে। সেই বিশাল প্রবাসী সমাজের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনই গড়ে দিয়েছে এমন এক প্রকল্প, যার ফল আজ কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়—প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা।

প্রবাসীদের সন্তানদের খুঁজে গড়ে তোলা দল

কেপ ভার্দের এই উত্থানের পেছনে আছে কেপ ভার্দিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের দূরদর্শী পরিকল্পনা। ২০০০ সালের শুরু থেকে সংস্থাটি বুঝে নেয়, ফুটবলে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে হলে ইউরোপে বেড়ে ওঠা প্রবাসী কেপ ভার্দিয়ান তরুণদের টেনে আনতে হবে। ফিফার নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত নিয়ম অনুযায়ী, এসব খেলোয়াড়ের অনেকেই তাদের পিতৃভূমির হয়ে খেলতে পারেন। এই নীতিই বদলে দেয় কেপ ভার্দের ফুটবল ভাগ্য। আফ্রিকার মধ্যেই তারা ধীরে ধীরে পরিণত হয় সম্মানজনক এক দলে।

বুবিস্তায় ফুটবলের নতুন অধ্যায়

এই দলের সাফল্যের নেপথ্যের মানুষ পেদ্রো লেইতাও ব্রিটো, যিনি সবাইকে কাছে পরিচিত বুবিস্তা নামে। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি স্পেনের বাদাজোজ ও পর্তুগালের এস্তোরিল ক্লাবে খেলেছেন। কোচিংয়ে আসার পর ২০০৭ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত জাতীয় দলের সহকারী হিসেবে কাজ করেন, আর ২০২০ সালে দায়িত্ব নেন প্রধান কোচ হিসেবে।

তার সর্বশেষ স্কোয়াডে ২৫ জনের মধ্যে ১৪ জনই দেশের বাইরে জন্ম নেওয়া। ব্রুনো ভারেলা, আয়াক্সের সাবেক গোলরক্ষক, যিনি ২০১৬ রিও অলিম্পিকে পর্তুগালের হয়ে খেলেছিলেন। স্টিভেন মোরেইরা কলম্বাস ক্রু দলের ডিফেন্ডার, যিনি ফ্রান্সের হয়ে ইউরোপীয় অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপে রানারআপ হয়েছিলেন। পুসকাস অ্যাকাডেমির দুই ভাই দেরয় (লুডোগোরেৎস) ও লারোস দুয়ার্তে— দুজনই নেদারল্যান্ডসে বেড়ে ওঠা।

তবে দলের মধ্যে সবচেয়ে অনন্য গল্প রবার্তো লোপেজের, ডাকনাম পিকো। লোপেসের মা আইরিশ, আর বাবা কেপ ভার্দিয়ান। তবে নিজের শিকড়ের সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি হয় জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর। “তখনই আমি জানতে শুরু করি আমার উৎস কোথায়, সংস্কৃতি কেমন। একবার আমরা আঙ্গোলার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচ খেলছিলাম। দর্শকরা আমার নাম ধরে চিৎকার করছিল—ওটা আমার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত। তখনই মনে হয়েছিল, ‘হ্যাঁ, আমি সত্যিই কেপ ভার্দিয়ান।’”

আইরিশ মা কেপভার্দিয়ান বাবার সন্তান পিকো লোপেজ

২০১৯ সালে কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন তাকে খুঁজে পায় একেবারে লিংকডউইনে, 'ভেবেছিলাম বার্তাটা স্প্যাম। কারণ আমি পর্তুগিজ জানতাম না, আর লিংকডইন ব্যবহার করতাম শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে। পরে ইংরেজিতে বার্তা পাঠানো হলে বুঝলাম এটা সত্যি, আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। এই অভিজ্ঞতা আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। আমি আফ্রিকার সংস্কৃতি জানলাম, নতুন ভাষা শিখলাম। নিজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারাটাই ছিল সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।”

ধারাবাহিক উন্নতি ও বিশ্বকাপের টিকিট

এই প্রকল্পের ফল পাওয়া যায় দ্রুতই। ২০১৩ ও ২০২৩—দুবার আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায় কেপ ভার্দে। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে খেলার খুব কাছাকাছি গিয়েও এক প্রশাসনিক ভুলে থেমে যেতে হয়। তিউনিশিয়াকে ২-০ গোলে হারালেও, খেলোয়াড় ফার্নান্দো ভারেলার চার ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তাকে খেলানোয় ফিফা ম্যাচটিতে তাদেরকে 'পরাজিত' ঘোষণা করে।  তবুও তাদের ফুটবল কাঠামো সংস্কারের লক্ষ্য থামেনি। অবশেষে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে তারা ইতিহাস গড়েছে। 

ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনোর প্রশংসা

কেপ ভার্দের এই ঐতিহাসিক অর্জনে অভিনন্দন জানিয়েছেন ৪৮ বিশ্বকাপের স্বপ্নদ্রষ্টা ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, 'কী ঐতিহাসিক মুহূর্ত! প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে পৌঁছানোর জন্য কেপ ভার্দের সবাইকে অভিনন্দন। তাদের পতাকা উড়বে এবং জাতীয় সংগীত বাজবে ফিফার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা ফুটবলে যে উন্নয়ন করেছে, তা অবিশ্বাস্য। এটি নতুন প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করবে।' 

এখন তারা অপেক্ষা করছে ৫ ডিসেম্বরের ড্রয়ের জন্য, যেখানে জানা যাবে বিশ্বকাপে তাদের গ্রুপের প্রতিপক্ষ কারা। পিকো লোপেজ বলেন, “এটা স্বপ্নের মতো। ছোটবেলা থেকে যেকোনো ফুটবলার একটিই টুর্নামেন্টের স্বপ্ন দেখে—বিশ্বকাপ। পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা এটা। নিজের দেশের হয়ে সেখানে নাম লেখানো—এটা এমন কিছু যা সারাজীবন বলার মতো গর্ব।”
“যে কেউ আমার গল্প শুনবে, আমি তাকে বলব—স্বপ্ন সত্যি হয়।”

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত