হেমিংয়েও ভালো হলো না মিরপুরের উইকেট

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:১৮ এএম

প্রায় ২ বছর পর আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেট ফিরল মিরপুরের শেরে বাংলা  ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। তবে এই সময়ে টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টিসহ অন্যান্য ক্রিকেট এই ভেন্যুতে হয়েছে নিয়মিতই। কিউরেটর গামিনি ডি সিলভার বদলে টনি হেমিং দায়িত্ব নিলেও খুব বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি মিরপুরের উইকেটে। সেই চিরচেনা কালো মাটির উইকেট, ব্যাটসম্যানদের কাছে দুর্বোধ্য আর স্পিনারদের আরাধ্য।

পাকিস্তানের বিপক্ষে এই ভেন্যুতেই জুলাই মাসে ৩টা টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলেছিল বাংলাদেশ। ২-১ ব্যবধানে সিরিজটা জিতলেও শেষ ম্যাচে ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা ছিল চোখে পড়ার মতো, ১৭৪ রান তাড়া করায় বাংলাদেশ অলআউট হয়েছিল ১০৪ রানে। প্রথম দুটো টি-টোয়েন্টিও ছিল লো-স্কোরিং। মিরপুরের এই ‘অসুখ’ নতুন নয়। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে টেস্টে হারাবার নীলনকশায় চ-িকা হাথুরুসিংহের প্রেসক্রিপশনে যে ধরনের উইকেট বানানো শুরু হয়েছিল, চেয়ারে বসা ব্যক্তিদের পরিবর্তন হলেও ২২ গজের চরিত্র বদলায়নি। গত ৫ বছরে শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হয়েছে ১৩টি ওয়ানডে ম্যাচ, তার একটি পরিত্যক্ত এই ম্যাচগুলোতে ওভারপ্রতি গড় রান ছিল ৪.৬৪। এই ম্যাচগুলোতে প্রথম ইনিংসে গড় রান ২৩০, দুই ইনিংস মিলিয়ে গড় রান ১৮৪। ৩০০ ছাড়ানো দলীয় ইনিংস মাত্র ১টি। পরের ওয়ানডে বিশ্বকাপ হবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েতে, দক্ষিণ আফ্রিকার নিউল্যান্ডসে ওভারপ্রতি গড় রান গত ৫ বছরে ৬ এর কাছাকাছি, জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্সে ৫.২৫ আর সেঞ্চুরিয়নের সুপারস্পোর্ট পার্কে ৫.৩০। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে হলেও ইনিংসে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ রান বেশি করতে হবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের।

মিরপুরের প্রথাগত উইকেটে খেলে যে অভ্যাসটা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

শনিবারের দুপুরে, উইকেট দেখে ধারাভাষ্যকার ফারভিজ মাহরুফ বিশ্লেষণ করেছেন, ‘আমি এখানে অনেক ম্যাচেই ধারাভাষ্য দিয়েছি, এমন উইকেট কখনো দেখিনি। অনেক বছরের ভেতর আমি এখানকার উইকেটে ঘাসের একটা চিহ্নও দেখছি না। প্রথম বলটা মাটিতে পড়ার আগেই মাটি কিছুটা নড়ছে। বোঝা যাচ্ছে উইকেট খানিকটা ধীরগতিরই হবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের টস জিতে বোলিং বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা খানিকটা অবাক করার মতোই। রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিক থেকে শিশির পড়া শুরু হয়। গত ৪ বছরে এখানে গড় রান হচ্ছে ২২৫, আমার মনে হয় এখানে ২২৫-২৩০ রানই যথেষ্ট হবে আজ রাতে। ধীরগতির উইকেট, স্পিনাররা নিঃসন্দেহে ছড়ি ঘোড়াবে। ব্যাটসম্যানরা ভুগবে, বিশেষ করে মাঝের ওভারগুলোতে। ‘মাহরুফের ভবিষ্যদ্বাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করে সন্ধ্যা ৭টা থেকেই চটের ছালা দিয়ে আউটফিল্ডের শিশির মোছা শুরু করে দেন মাঠকর্মীরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসের তখন ১৭.১ ওভার, রান ৭৬। প্রথম দুটো ওভার মেডেন দেওয়ার পরও ওভারপ্রতি গড়ে ৪.২৬ রান করে তুলছিলেন ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরা।

শিশির ভেজা উইকেটের কারণেই কি ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা সহজে ব্যাট করতে পারছিলেন, নাকি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের অতি সতর্ক মানসিকতার সঙ্গে দক্ষতার অভাবই রানটা কমিয়ে রাখল, সেটা বোঝার উপায় নেই। তবে ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দ্বিতীয় কারণটাকেই সামনে আনবে। এই বছর বাংলাদেশ খেলছে নবম ওয়ানডে, তার মধ্যে মাত্র একটা ম্যাচেই বাংলাদেশ অলআউট না হয়ে পুরো ৫০ ওভার ব্যাট করতে পেরেছে। সেটা আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। তাও ৯ উইকেট হারিয়েছিল বাংলাদেশ, অল্পের জন্য অলআউট হয়নি। বাকি ৮ ম্যাচেই ৫০ ওভার ব্যাটিং করা সম্ভব হয়নি বাংলাদেশের, ইনিংসের সর্বনিম্ন ২ বল বাকি থেকে সর্বোচ্চ ২২ ওভার ৫ বল বাকি থাকতেই অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ।

৪৯.৪ ওভারে ২০৭ রানে অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ, ২৯৮টা বৈধ ডেলিভারির মধ্যে ১৮৩টা বলেই কোনো রান নিতে পারেননি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। অর্থাৎ ৫০ ওভারের ম্যাচে ৩০ ওভারের বেশি থেকে কোনো রান নিতেই পারেননি শান্ত-মিরাজ-অংকনরা। সবচেয়ে বেশি ৫৬টা ডট বল খেলেছেন তাওহীদ হৃদয়, তার ৯০ বলে ৫১ রানের ইনিংসে ৫৬টা ডট বল। নাজমুল হোসেন শান্তর ৬৩ বলে ৩২ রানের ইনিংসে ৪৩টা ডট বল আর মাহিদুল ইসলাম অংকনের ৭৬ বলে ৪৬ রানের ইনিংসে ৪৯টা ডট বল। প্রতিপক্ষে স্বর্ণযুগের ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেসাররা ছিলেন না, ছিলেন না শেন ওয়ার্ন কিংবা মুত্তিয়া মুরালিধরনের মতো কোনো স্পিনার। তবুও যে সতর্কতার সঙ্গে খেললেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা, তাতে দোষ কতটা উইকেটের আর কতটা ব্যাটসম্যানের সেই প্রশ্নও চলে আসে।

এই দ্বিধা থেকে বেরিয়ে আসার একটাই উপায়, দেশের মাটিতে ব্যাটিং সহায়ক উইকেট বানানো। তারপরও যদি ব্যাটসম্যানরা খারাপ করেন, তাহলেই বের হয়ে আসবে সত্যিটা। তা না হলে ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা ব্যাটাই চোর’, এর মতো উইকেটের ওপরই আসবে একের পর এক অভিযোগ আর অজুহাত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত