আজ শুরু হচ্ছে জাতীয় ক্রিকেট লিগের ২৭তম আসর। এই প্রতিযোগিতায় সফলতম দল খুলনা, তবে শেষ ৪ মৌসুমে তাদের একটিও শিরোপা নেই। খুলনা দল, কোয়াব আর ঢাকা লিগকে ঘিরে অনিশ্চয়তা সব নিয়েই খুলনার অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন এর সঙ্গে লম্বা আলাপ সামীউর রহমানের
জাতীয় ক্রিকেট লিগের গত আসরে খুলনা হয়েছিল পঞ্চম। এবারের আসরে আপনাদের শুরুটা হচ্ছে বরিশালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। এই মৌসুমে খুলনার লক্ষ্য, প্রস্তুতি এবং বাস্তবতা সব নিয়ে কী মনে করেন?
মোহাম্মদ মিঠুন : আমরা শেষ কয়েক বছরে একটু ভুগছি, বিশেষ করে ৪ দিনের ম্যাচে। আমাদের দলের ভেতর এটা নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে, কেন কাক্সিক্ষত ফল আসছে না সেসব নিয়ে কথাও বলেছি। আমাদের উদ্দেশ্য চ্যাম্পিয়ন হওয়া। (এনসিএল) টি-টোয়েন্টির সময়ও বলেছিলাম, অনেক দিন ধরে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি খুলনায় যাচ্ছে না, যদিও খুলনারই চ্যাম্পিয়নের ট্রফি সবচেয়ে বেশি। যেহেতু আমাদের রেপুটেশন এ রকম ছিল, লম্বা সময় ধরে মাঝখানে সেটা মিসিং আছে। আমাদের মধ্যে এই পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আলোচনাও হয়েছে। আশা করি যে এই বছর আমরা অনেক ভালো করব।
আপনার প্রথম শ্রেণির ম্যাচ ১৩৭টা, সবশেষ মৌসুমে এনসিলে ৪৪৯ রান। আপনার টেস্ট ক্যারিয়ারটা কি মাত্র ১০ টেস্টেই থেমে যাবে?
মিঠুন : এখন এসব তো আর আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, আমরা ততটুকুই চিন্তা করি যতটা আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট প্রতিবছরই খেলছি। চেষ্টা করি নিজের সেরাটা দেওয়ার। সত্যি কথা বলতে আমাদের দেশে ঘরোয়া পারফরম্যান্স দেখে খুব একটা যে জাতীয় দলে বিবেচনা করা হয়, এই জিনিসটা কিন্তু না। ঘরোয়া লিগে খুব একটা মনোযোগ থাকে না। এই পারফরম্যান্সকে গুনতিতেও ধরে না। সবসময় দেখবেন বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকেই খেলোয়াড়দের বাছাই করে তারপর ওদেরই খেলাতে খেলাতে সুযোগ দিতে দিতে ওপরে তুলে আনে। কেউ টি-টোয়েন্টিতে ভালো করে, তাকে টেস্ট খেলায় দেয়। আমাদের তো ও-রকম কাঠামোই তৈরি হয়নি যে যারা ৪ দিনের ম্যাচে ভালো করবে তাদের টেস্টে খেলাবে। পারফর্ম করলেই যে সুযোগ পাওয়া যাবে এটার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এবার জাতীয় লিগের ২৭তম আসর হতে যাচ্ছে। তাহলে টেস্ট ক্রিকেটে এনসিএলের অবদান কী?
মিঠুন : বিষয় হচ্ছে প্রত্যেকটা সেক্টরেই পেশাদারি আরও বাড়াতে হবে। বলা হচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের কথা, প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব অন্যান্য জায়গাতেও আনতে হবে। আমাদের সামগ্রিক কাঠামোই তো ভালো না। একটা টেস্ট দল হিসেবে আমাদের ম্যাচ ফির কাঠামো কোনোভাবেই ভালো বলা চলে না। অন্যান্য ক্রিকেট বোর্ডে খেলার পেছনে, খেলোয়াড়দের পেছনে যে ব্যয়টা করে সেটা তাদের আয়ের ২০-৩০ শতাংশ, কোনো কোনো বোর্ডে ৪০ শতাংশ। আমি যতটুকু শুনেছি, বাংলাদেশে ক্রিকেটের পেছনে বা খেলোয়াড়দের পেছনে ব্যয় হয় ১ শতাংশের কম। আমিও ভুলও জেনে থাকতে পারি। এই জায়গাগুলোতে সমতা আসা উচিত কারণ বোর্ড তো আয় করছে খেলোয়াড়দের দিয়েই। ক্রিকেট উন্নয়নের পেছনে, খেলোয়াড়দের পেছনে যদি এই অর্থ বিনিয়োগ না করা হয় তা হলে প্রতিদানও তো কমই আসবে। তবে ধাপে ধাপে উন্নতি হচ্ছে, ১০০ ভাগ হচ্ছে এটা বলব না। সঠিক পরিকল্পনা করলে, উদ্দেশ্য সৎ থাকলে উন্নতি করা সম্ভব।
নতুন দল হিসেবে এনসিএলে খেলছে ময়মনসিংহ। ঢাকা মেট্রোকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানান যুক্তি আছে। আপনি কী মনে করেন এই ব্যাপারে? এতে করে কি প্রতিযোগিতার মান বাড়ল না কমল?
মিঠুন : এতে করে বাড়ারও কিছু নেই কমারও কিছু নেই। যেহেতু ৮টা দল, যার যার বিভাগে যে কোনো খেলোয়াড় প্রথম প্রায়োরিটি পায়। সে তার বিভাগে সুযোগ না পেলে অন্য বিভাগে খেলে। এ ব্যাপারে আমাদেরও আলোচনা হয়েছিল বোর্ডের সঙ্গে, আমরা বলেছিলাম ৯টা দল করা যায় কি না। ঢাকা মেট্রো অনেক বছর ধরে খেলেছে, তাদের অনেক অবদানও আছে। ময়মনসিংহও বিভাগ হিসেবে নিজস্ব দলের দাবিদার। সে ক্ষেত্রে কাউকে বাদ না দিয়ে দুটো দলকেই রাখা যেত তাহলে আরও ১৫-২০ জন খেলোয়াড় বেশি সুযোগ পেত। আমি মনে করি যত বেশি খেলোয়াড় সুযোগ পাবে, তাদের ভেতর থেকে তত বেশি পারফরমার বের হয়ে আসবে। দল বাড়ালে মান কমবে বলে মনে হয় না। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ তো অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টুর্নামেন্ট, ঢাকা লিগে ১২টা দল খেলে না! আমরা আসলে কিছু মানুষের ইতিবাচক সাড়াই পেয়েছিলাম ৯ দলের ব্যাপারে, ফাইনালে কেন রাখা যায়নি সেটা আমি বলতে পারব না।
এর আগে কোথাও কোনো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন? কোয়াব সভাপতি হওয়ার পর জীবনে কি পরিবর্তন এসেছে?
মিঠুন : না, জীবনে এর আগে কোথাও কোনো নির্বাচনে অংশ নিইনি। জীবনে পরিবর্তন বলতে দায়িত্ব অনেক বেশি চলে আসছে। আগে তো নিজেকে নিয়ে বা নিজের পরিবারকে নিয়ে ছিলাম। সেই দায়িত্বগুলোই পালন করতাম। এখন পুরো ক্রিকেট অঙ্গনের যত সমস্যা, এই সব কিছুতেই তো মাথা ঘামানো লাগে। এত সমস্যা একজনের জন্য সমাধান করা সম্ভব নয়, তবে দায়িত্বশীল একটা জায়গা থেকে ব্যাপারটা এড়িয়েও যাওয়া যাবে না। কতটুকু পারলাম, না পারলাম এর চেয়ে বড় কথা আমার উদ্দেশ্যটা কী। খেলোয়াড়দের সমস্যা হচ্ছে, তাদের পক্ষে আমি দাঁড়াচ্ছি কি না। ক্রিকেটের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, আমি কোনো কথা বলছি কি না। এটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কোয়াব এত শক্তিশালীও না যে আমরা বললে একটা কিছু হয়ে যাবে। তবে আমরা একটা আওয়াজ উঠাতে পারি যে এটা ভুল এটা ঠিক। প্রত্যেক মানুষের বিবেক আছে। আমরা অন্য কারও সাপোর্টে না, প্রধান কাজ হচ্ছে খেলোয়াড়দের পাশে থাকার। অন্য কোনো ইস্যু যেন আমাদের প্রভাবিত করতে না পারে।
কোয়াবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে যদি জানতে চাওয়া হয় আপনার সময়ে একটা সুনির্দিষ্ট কাজ যেটা করে যেতে চান সেটা কী?
মিঠুন : একটা কাজ বললে তো... আমাদের তো অনেক কাজ তবে যেটা বলতে চাই যে আমি একটা কাঠামো গড়ে দিয়ে যেতে চাই সংগঠনের। এখন তো আমাদের কিছুই নেই। আমাদের একটা অফিস প্রয়োজন, জেলায় কমিটি গড়ে দেওয়া দরকার কারণ ওদের দিয়ে জেলার লিগগুলো চালু করতে হবে। আগে প্রতিটা জেলায় জেলায় লিগ হতো, এখন জেলা লিগ বিশ্বকাপের মতো হয়ে গেছে! প্রতি ৪-৫ বছরে ১ বার হয়! খেলোয়াড় উঠে আসে এই জেলা লিগ থেকেই। একটা খেলোয়াড়ের প্রথম ক্রিকেট বলের ম্যাচ হওয়া উচিত নিজের জেলায়, স্থানীয় ক্লাবে। আমাদের এই সুযোগ-সুবিধাগুলো খুবই কম। এসব কীভাবে বাড়ানো যায়। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবীমা, কার্যালয় স্থাপন, এসব আছে। একটা তহবিল গঠন করা, এখন আমাদের ফান্ড লাগবে। আমরা একজন আর্থিক উপদেষ্টা নিয়োগ দিতে চাই যিনি আমাদের পরামর্শ দেবেন কীভাবে তহবিল বাড়ানো যায়। ক্রিকেট বোর্ড থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে কার্যালয় সংস্কার করে দেওয়ার, আমরা চিঠি দিয়েছি। আগে ছিল ০ তহবিল, এখন আমাদের২৫-৩০ লাখ টাকার একটা তহবিল আছে। অনেক পরিকল্পনাই আছে, আমরা যেখানে থেমে যাব পরের কমিটি এসে সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কিছুদিন আগে, তামিম ইকবালের নেতৃত্বে বিসিবি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে লিগ বর্জন করা ক্লাব সংগঠকদের কাছে গিয়েছিলেন আপনি। কী কথা হলো বা কী সিদ্ধান্ত এলো?
মিঠুন : উনাদের সঙ্গে বৈঠকে আমাদের পক্ষ থেকে কনভিন্স করার চেষ্টা করেছি। আমাদের মূল কথাটা ছিল এটাই, দেখেন আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কারও সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু দিনশেষে আমরা সবাই ক্রিকেটের জন্যই কাজ করছি, সেটা ক্লাব বলেন আর বোর্ড বলেন। এখন ক্লাব আর বোর্ডের ঝামেলার জন্য তো খেলোয়াড় ভুক্তভোগী হতে পারে না। ঢাকা লিগ সবচেয়ে বেশি ক্রিকেটার খেলে, এখান থেকেই তারা আর্থিকভাবে উপকৃত হয়। তৃতীয় বিভাগ থেকে প্রিমিয়ার, এই টুর্নামেন্টগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কতগুলো ক্রিকেটার ভুক্তভোগী হবে। উনাদের ব্যক্তিগত কোনো সমস্যার কারণে এতগুলো খেলোয়াড় তো ভুগতে পারে না। আমরা অনুরোধ করেছিলাম যে আপনাদের ব্যক্তিগত সমস্যার তো আমরা সমাধান করে দিতে পারব না। এটা আমাদের হাতে নেই। আমরা আপনাদের অনুরোধ করছি, এতদিন ধরে আপনারা খেলোয়াড়দের পাশে ছিলেন, খেলোয়াড়রাও ছিল। এসব ইস্যুর কারণে খেলোয়াড়রা ক্ষতিগ্রস্ত হোক, এটা কাম্য নয় আমাদের। এসব বলেছি আমরা। উনাদেরও তো আর একজন দুজন ছিলেন না, অনেকজন ছিলেন; তাদের অনেকেই আমাদের সঙ্গে একমত হয়েছেন। উনাদের যে অবস্থান ছিল সেখান থেকে অনেকটাই শীতল অবস্থায় আসছে। পরে আমরা ব্যাপারটা সিসিডিএম চেয়ারম্যানকে জানিয়েছি। উনাকে বলেছি উনাদের সঙ্গে আপনাদের যে সমস্যা, একপক্ষ থেকে তো কিছু হয় না, সমাধান করতে হলে দুপক্ষ থেকেই আগাতে হয়। আমরা ক্লাবের সঙ্গে কথা বলেছি, উনারা একটু নমনীয় হয়েছেন। এখন আপনারা একটু উদ্যোগী হন। তিনিও আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। ব্যাপারটা এখন এই পর্যায়েই আছে।
