বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘গণতন্ত্রকামী শক্তিগুলোর ওপর ফ্যাসিবাদী সরকারের দমন-পীড়নের কথা জাতি ভুলে যায়নি। ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় বিএনপির ৬০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০ হাজার কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে এবং অনেককে গুম করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, নয়া দিগন্তের মালিক মীর কাসেম আলী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেক আলেম-ওলামাকে মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব এই জাতির ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায়।’
গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল এ কথা বলেন। ছোটখাটো সমস্যা দূরে রেখে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফখরুল বলেন, ‘নির্বাচনের ঘোষণা এসেছে। আশা করছি, এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো সমাধান হয়েছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশের উত্তরণ সম্ভব হবে। বিএনপি বিশ্বাস করে, গণতান্ত্রিক পথই জাতির একমাত্র মুক্তির পথ। তাই দলীয় ও রাজনৈতিক ছোটখাটো পার্থক্য ভুলে সবাইকে ভোটের মাঠে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাই।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এই দেশবাসী একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চায়, এমন এক বাংলাদেশ, যা কোনো বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণে নয়, জনগণের ইচ্ছায় পরিচালিত হবে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও মতানৈক্য বড় পরিসরে বাড়তে না দিয়ে নির্বাচনী ট্রেনকেই দলগুলোর গন্তব্য মনে করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালের বাকশাল শাসনের সময় ছিল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের দুঃসময়। তখন সাংবাদিকরা বেকার হয়েছিলেন, অনেকে রাস্তায় হকারি করেছেন। পরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।’
বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই পত্রিকাটি দেশের মানুষের আকাক্সক্ষা ও গণতন্ত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভেদের কারণে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন ঘটলে জাতি ক্ষমা করবে না বলে মন্তব্য করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অতীতের ওপর ভিত্তি করে আমরা সামনে এগোব। আমাদের সন্তানদের জন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র রেখে যেতে হবে। সামনের দিনে রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য থাকলেও দেশের প্রশ্নে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাই এক থেকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন ঠেকাবেন এমন প্রত্যাশা থাকবে। আমাদের বিভেদের কারণে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন ঘটলে এই জাতি আমাদের ক্ষমা করবে না।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দুই-চার কলাম লেখার জন্য আমাকে প্রায় সাড়ে ৯ বছর নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। আমাকে আয়নাঘরে এবং কারাগারে নির্যাতন করা হয়েছে। কিন্তু আমি কখনো সংগ্রামের পথ থেকে পিছিয়ে যাইনি।’
তিনি বলেন, “একসময় আমি এবং আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ভাই পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে ছিলাম। করোনারি কেয়ার ইউনিটের একটি সেলে আমাদের রাখা হয়েছিল, যেখানে আমরা একে অন্যকে দেখতে পেতাম। তিনি তখন অনশন করছিলেন। আমি তাকে অনুরোধ করেছিলাম, ‘আপনি যদি মারা যান, শেখ হাসিনা খুশি হবে, দয়া করে অনশন ভঙ্গ করুন।’ পরে কয়েকজন প্রবীণ নেতা গিয়ে ছয়-সাত দিন পর তার অনশন ভঙ্গ করান।”
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘আজ আমরা ছাত্র আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস স্মরণ করেছি, রক্তঝরা দিনগুলোর কথা মনে করেছি। সেই সংগ্রামী অতীতই আমাদের আগামীর বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণা হবে। আমাদের সন্তানদের জন্য একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই হবে আমাদের মূল দায়িত্ব। আমাদের সন্তানদের রক্তে লেখা অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের সব পথ রুদ্ধ করতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
