পৃথিবীর বৃহত্তম শহরে নবাগত মুসলিমের দিনলিপি

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:১৯ এএম

জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম শহর জাপানের টোকিও। এ শহরে ৩ কোটি ৭৮ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করেন। জাপানে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ, যাদের বড় একটি অংশ টোকিওতে থাকেন। জাপানে এসেছি মাত্র এক সপ্তাহ হলো। টোকিওতে দ্বিতীয় সপ্তাহে পা দিতেই মনে হচ্ছে, বলার মতো অভিজ্ঞতার শেষ নেই। আগামী দুই সেমিস্টার আমি এখানে পড়ব। সময়টা যথেষ্ট দীর্ঘ, তাই আশা করছি এই শহরে মুসলিম হিসেবে আমার জীবনের নানা দিক নিয়ে ধীরে ধীরে লিখতে পারব। আজ বলব টোকিওতে মুসলিম হিসেবে আমার প্রথম সপ্তাহের অভিজ্ঞতার কথা।

জাপানে আসার আগে আমার দুটি প্রধান উদ্বেগ ছিল, হালাল খাবার পাওয়া যাবে কি না এবং নামাজ পড়ার জায়গা পাব কি না? মুসলমানদের জন্য খাবারের কিছু নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আছে। শূকরের মাংস হারাম, তেমনি যে পশু ইসলামি নিয়মে জবাই করা হয়নি, তার মাংসও খাওয়া নিষিদ্ধ। তবে মাছ ও সামুদ্রিক খাবার এর আওতার বাইরে। টোকিওতে মাছের পদে অভাব নেই, নিরামিষ খাবারেরও অনেক বিকল্প রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, মেনুতে লেখা বুঝতে পারা এবং রেস্টুরেন্টের কর্মীদের সঙ্গে নিজের খাদ্যবিধি নিয়ে সঠিকভাবে কথা বলা।

প্রথম কয়েকদিন বিভ্রান্তি এড়াতে আমি মূলত দোকান থেকে প্যাকেটজাত খাবার কিনে খেতাম কিংবা উবার ইটসের সাহায্য নিতাম। প্রথমবার সরাসরি রেস্টুরেন্টে খেতে যাই এক তুর্কি নাগরিকের দোকানে, যিনি ইংরেজি জানতেন এবং হালাল শাওয়ারমা বিক্রি করছিলেন। তবে বুঝলাম, যদি কেবল এমন কাকতালীয় সুযোগের ওপর নির্ভর করি, তাহলে জাপানে খাওয়া বেশ কঠিন হয়ে যাবে। তাই ঠিক করলাম, কিছু দরকারি জাপানি শব্দ ও বাক্য শিখব, যেমন ‘আমি খেতে পারি’ বা ‘খেতে পারি না’। এরপর ‘মাংস’ ও ‘মাছ’-এর জাপানি শব্দ যোগ করে বাক্যগুলো অনুশীলন করলাম। শেখা সহজ হলেও কথা বলার আত্মবিশ্বাস জোগাড় করাই ছিল আসল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ক্ষুধা তো বলবান শিক্ষক! তাই তাড়াতাড়িই চেষ্টা শুরু করলাম।

এখানে নামাজের জায়গা খুঁজে পাওয়া খাবারের চেয়ে অনেক কঠিন। মুসলমানদের দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হয়। বেশির ভাগ সময় আমি ডরমেটরিতে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রার্থনাকক্ষে নামাজ আদায় করি। কিন্তু বাইরে বের হলে সেটা জটিল হয়ে পড়ে। সবচেয়ে সহজ সমাধান মসজিদে যাওয়া। কিন্তু টোকিওতে মসজিদের সংখ্যা খুবই কম। তাই অনেক সময় বিকল্প খুঁজতে হয়।

আমি সাধারণত এমন কোনো নিরিবিলি পার্ক বা খোলা জায়গা খুঁজে নিই যেখানে অন্যদের বিরক্ত না করে নামাজ পড়া যায়। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা সব সময় সুখকর হয় না। অনেক সময় মানচিত্রে দেখা পার্কে গিয়ে দেখি, সেখানে প্রার্থনার মতো নির্জন কোনো কোণ নেই। গুগল ম্যাপের সাহায্যও সব সময় নির্ভরযোগ্য নয়।

সব মিলিয়ে বলতে পারি, টোকিওতে মুসলমান হিসেবে জীবনধারা রপ্ত করতে সময় লাগছে। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠা গেলে হালাল খাবারের সমস্যা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। তেমনি শহরের সঙ্গে পরিচয় বাড়লে নিরিবিলি জায়গায় নামাজের ব্যবস্থা করাও সম্ভব। আমি এখন শিখছি কীভাবে এই ব্যস্ত নগরীতে মুসলমান হিসেবে নিজের পরিচয়, অভ্যাস ও ধর্মীয় দায়িত্বগুলো ধরে রাখতে হয়। হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টোকিও আমার কাছে শুধু এক বিদেশি শহর নয়, বরং মুসলমান জীবনের নতুন অভিজ্ঞতার বিদ্যালয় হয়ে উঠবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

ফান্ড ফর এডুকেশন অ্যাব্রড থেকে ভাষান্তর- মুহসিনা জামান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত