জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫ বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকেই সিদ্ধান্ত আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বেঁধে দেওয়া সাত দিন সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ নিয়ে ঐকমত্যে আসতে পারছে না, যদিও সনদ প্রায় চূড়ান্ত। একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এ কথা জানিয়েছেন।
সূত্র জানায়, সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দেওয়া সুপারিশ মেনে নিতে রাজনৈতিক ঐক্য অনিশ্চিত করেছে কমিশন নিজেই। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় যেসব ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলোতে কাটাছেঁড়া করা না হলেও আলোচনা হয়নি এমন কিছু বিষয় সুপারিশে তুলে না ধরলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্যের সৃষ্টি না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলের মতামত উপেক্ষা করে বিষয়টিকে জটিলতার দিকে নিয়ে গিয়েছে। সৃষ্ট অনৈক্যের জন্য দায়ী ঐকমত্য কমিশনই। দলগুলোকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে কমিশন।
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক দল ক্ষমতা ও ভোটের রাজনীতি করে। ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে হয় তাদের। ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে গৃহীত মতামতকে উপেক্ষার কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে পৌঁছার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরেছে সরকার ও জুলাই আন্দোলনের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোকে। সনদে থাকা বিভিন্ন ইস্যুতে আলাদা আলাদা অবস্থান অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে।
সরকারের বিভিন্ন সূত্র ও একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তও রাজনৈতিক দলগুলোতে ঐক্য ফেরাতে পারবে না। সরকারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক দূরত্ব তৈরি করবে।’
জানা গেছে, জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের গতকাল এক অনুষ্ঠানে আঙুল বাঁকা করে ঘি তুলবেন বলে যে বক্তব্য রেখেছেন তা রাজনীতিতে ব্যাপক দূরত্ব তৈরির ইঙ্গিত। যে কোনো সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কড়া বক্তব্য ও অবস্থান জানিয়ে দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কঠোর অবস্থান নিয়ে বসে আছে। সনদে এখনো তাদের স্বাক্ষর করা হয়নি। এটিকেও জটিলতা সৃষ্টির উপাদান হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংস্কার ও সনদ ঘিরে যেসব সংকট সামনে আসছে সেগুলো না হওয়ার সুযোগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই প্রয়োজনীয়-অতি প্রয়োজনীয় সংস্কার করে বাকি কাজগুলো নির্বাচিত সরকার করবে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিদায় নিয়ে চলে গেলে এমন অনিশ্চয়তার পথে আমাদের হাঁটতে হতো না। সব করবে অন্তর্বর্তী সরকার এ নীতি অনুসরণ করে এখন কোনোটাই হবে না এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈক্যে সরকারের ভিতও দুর্বল হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন জটিল এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে পড়েছে আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলো। সব কিছুই অনিশ্চয়তার দিকে চলে গেছে। কী হওয়ার প্রয়োজন ছিল, কী হচ্ছে, কী হবে কিছুই বলা যাচ্ছে না।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জটিলতার মূল কারণ নির্বাচনকে দীর্ঘায়িত করার প্রয়াস। প্রয়োজনীয়, অতি জরুরি সংস্কার করে সরকার নির্বাচন দিয়ে বিদায় নিলে সংকটগুলো সামনে আসত না।’ তিনি বলেন, ‘দেশ ও দেশের জনগণ সংকটময় অবস্থার দিকে যাচ্ছে।’
বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দেওয়া সুপারিশ রাজনৈতিক দলগুলোকে অনৈক্যের দিকে নিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। যদি সরকারই বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেবে তবে যেগুলোতে ঐকমত্য হয়েছে আর যেগুলোতে হয়নি সুপারিশে সবগুলো স্পষ্ট করে সরকারের হাতে দিতে পারত।’
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনির্বাচিত সরকারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নিতে পারি না। আমরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করি, জনগণের কাছে আমাদের জবাবদিহি করার আছে। চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে রাজনীতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারি না আমরা।’ তারা বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় কতগুলো ব্যাপারে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে আমরা ঐকমত্য পোষণ করি। সেগুলোকে বাদ দিয়ে কমিশন সরকারের হাতে সুপারিশ তুলে দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। জনগণের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ নষ্ট করে দিতে চায় সরকার।’ সরকারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত বিএনপির পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব ব্যাপার। বিএনপির নেতারা বলেন, ‘জামায়াত ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সুযোগের রাজনীতি করছে। তাই পিআর, আগে গণভোটসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছে। দলটির এসব দাবি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সুযোগের সন্ধানের রাজনীতি।’
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেছে, পুরনো সিস্টেম বাদ দিয়ে নতুন সিস্টেমে দেশ চলবে এ ধারণা নিয়ে দেশে একটি সফল আন্দোলন হয়েছে। এ আন্দোলনে বিজয়ী হয়েছি আমরা। অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে জামায়াত। বিএনপি পুরনো ধ্যান-ধারণা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। জামায়াত সেটা হতে দিতে পারে না।
