সন্তানের নামকরণে ইসলামের নির্দেশনা

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৫, ০২:০৬ এএম

 বর্তমান সময়ের তথাকথিত আধুনিক ও ফ্যাশননির্ভর সমাজে ইসলামের সত্য ও মৌলিক শিক্ষাগুলো তুলে ধরা কখনো কখনো কঠিন হয়ে যায়। যে জাতি নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও প্রতীক সম্পর্কে অজ্ঞ এবং মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনা বাদ দিয়ে খেয়ালখুশি মতো জীবনযাপনকে প্রাধান্য দেয়, সেই জাতির সামনে ধর্মীয় অজ্ঞতার এই অন্ধকারে ইসলামের সহজ-সরল শিক্ষা পৌঁছানো বিশাল চ্যালেঞ্জ। ফ্যাশনের নামে সমাজে যেসব বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভালো ও অর্থবহ নাম না রাখা।

বর্তমান যুগে অনেকেই মনে করেন, আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ (আসমাউল হুসনা), নবী-রাসুল, সাহাবায়ে কেরাম এবং দ্বীনদার ব্যক্তিদের নামে সন্তানদের নাম রাখা নাকি পুরনো ধারা বা সেকেলে মনোভাব। তাদের যুক্তি, ‘দুনিয়া এত এগিয়ে গেছে, আর এক শ্রেণির মানুষ এখনো পুরনো চিন্তাধারার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে।’ আসলে তারা বুঝতে চায় না যে, ইসলামি জীবনব্যবস্থার প্রতিটি বিধানের ভেতরেই লুকিয়ে আছে দুনিয়া ও আখেরাতের অনন্ত কল্যাণ, সাফল্য ও মুক্তির রহস্য।

মুসলিম সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা আধুনিক যুগের সব খেয়ালি প্রভাব ও সংস্কৃতির অনুসারী হতে চান। এই তথাকথিত নতুনত্বের মোহে পড়ে তারা তাদের সন্তানদের ভালো অর্থবহ নাম রাখছেন না। তাদের কাছে এই প্রশ্নই আসে না, এই নামটি কি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য? এটি কি শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় ও পছন্দনীয়? ফলাফল হলো, আজ এমন অনেক নাম শোনা যায়, যেগুলো শুনে বোঝা যায় না, এই নামধারী ব্যক্তি মুসলিম না অমুসলিম, পুরুষ না নারী! এই হলো আজকের সমাজের এক করুণ চিত্র, যেখানে ফ্যাশন ও তথাকথিত অগ্রগতির নামে আমরা ধীরে ধীরে নিজের ইসলামি পরিচয়, ঐতিহ্য ও আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলছি। ইসলামি নামকরণ এক সময় ছিল ইমানের প্রতীক, তা আজ সেকেলে ভাবনা বলে পরিত্যক্ত হচ্ছে।

অর্থবহ ইসলামি নাম রাখা মা-বাবার জন্য সন্তানের প্রতি উত্তম আচরণের অংশ ও প্রথম দায়িত্ব। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো পিতা তার সন্তানকে উত্তম চরিত্র ও সুন্দর শিক্ষা দেওয়ার চেয়ে ভালো কিছু দান করতে পারেন না।’ (সুনানে তিরমিজি)

নবজাতকের এমন নাম রাখা উচিত, যা মহান আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-এর নির্দেশিত প্রিয় নামসমূহের অন্তর্ভুক্ত। যেসব নামের অর্থে ইমানের দৃঢ়তা, চরিত্রের পবিত্রতা ও উত্তম নৈতিকতার প্রকাশ ঘটে, সেসব নামই বরকতময় ও প্রিয়। রাসুল (সা.) বলেছেন: ‘তোমরা নবীদের নামে তোমাদের নাম রাখো। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম হলো আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।’ (সহিহ মুসলিম) যেমন নাম রাখা উচিত তা উল্লেখ করা হলো।

আল্লাহর দাসত্বমূলক নাম : যে নামের মধ্যে আল্লাহর কোনো গুণবাচক নামের সঙ্গে বান্দার দাসত্ব ও আনুগত্যের প্রকাশ রয়েছে, যেমন আবদুল খালেক, আবদুল মালেক, আবদুর রাজ্জাক, আবদুল মান্নান ইত্যাদি নামসমূহ।

নবী-রাসুল ও নেককারদের নাম : নবী-রাসুল, সাহাবায়ে কেরাম এবং নেককারদের নামে নামকরণ বরকত লাভের মাধ্যম।

ভালো অর্থবোধক নাম : হাদিসে ভালো অর্থবোধক নাম রাখার কথা বলা হয়েছে। কেননা নামের প্রভাব ব্যক্তির ওপর পড়ে। তাই সব মা-বাবার উচিত সন্তানের ভালো অর্থবোধক নাম রাখা।

মেয়েদের নাম : ছেলেদের জন্য যেমন উপরোক্ত নাম রাখা উচিত, তেমনি মেয়েদের জন্য আমাতুল্লাহ, আমাতুর রহমান (আল্লাহর দাসত্বমূলক নাম) এবং নবীজির পবিত্র পতœী ও নারী সাহাবিদের নামে নাম রাখা। যেমন খাদিজা, ফাতেমা, আয়েশা, সুমাইয়া, জয়নব, সাবিরা ইত্যাদি।

খারাপ অর্থবোধক নাম রাখা নিষিদ্ধ : আমাদের উচিত নয় এমন নাম রাখা, যার অর্থে অশ্লীলতা, দুশ্চরিত্র, কঠোরতা বা ধর্মবিমুখতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইসলামে যেমন সুন্দর ও অর্থবোধক নাম রাখার ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, তেমনি ভুল বা খারাপ অর্থবোধক নাম রাখা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা একে অপরকে অপমানজনক উপাধি বা খারাপ নামে ডেকো না।’ (সুরা হুজুরাত ১১)

আত্মপ্রশংসামূলক নাম পরিহার করা : রাসুল (সা.) এমন নাম রাখতেও নিষেধ করেছেন, যাতে আত্মপ্রশংসা বা অহংকার প্রকাশ পায়। যেমন হজরত জয়নব বিনতে আবি সালমা (রা.)-এর নাম ছিল বাররাহ (নেককার মহিলা)। রাসুল (সা.) বললেন, তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে প্রশংসা করো না, আল্লাহই ভালো জানেন তোমাদের মধ্যে কে প্রকৃত নেককার। এরপর তিনি বললেন, তার নাম রাখো জয়নাব। (সহিহ মুসলিম) কারণ, নামের প্রভাব প্রায়ই তার অধিকারীর মধ্যে প্রকাশ পায়। এমন নাম রাখলে মানুষের অন্তরে গর্ব, অহংকার ও আত্মপ্রশংসার ভাব জন্ম নেওয়ার আশঙ্কা থাকে। অথচ মহান আল্লাহ সেই ব্যক্তিকেই ভালোবাসেন, যার অন্তরে বিনয়, নম্রতা ও আজ্ঞাবহতা আছে।

মন্দ নাম পরিবর্তন : মন্দ নাম পরিবর্তন করা নবী (সা.)-এর সুন্নত। আমাদের সমাজে নাম রাখার ক্ষেত্রে অতি মাত্রার বাড়াবাড়ি ও অবহেলা দুটোই দেখা যায়। কেউ কেউ প্রভাবশালী ও দাপটশালী শোনায় এমন অদ্ভুত নাম রাখে, আবার কেউ কেউ অজ্ঞতার কারণে এমন নাম রাখে, যা আল্লাহর অবাধ্যতা বা ধর্মবিরোধী অর্থ বহন করে। যেমন ‘আসী’ (অবাধ্য), ‘আসিয়া’ (অপরাধী) ইত্যাদি।

রাসুল (সা.) এ ধরনের নামকে অপছন্দ করেছেন এবং সেগুলো পরিবর্তন করার নির্দেশ দিয়েছেন। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ‘আসিয়া’ নামক মহিলার নাম পরির্বতন করে তার নাম রাখেন ‘জামিলা’।

মা-বাবার প্রতি আহ্বান : মা-বাবার ওপর সন্তানের প্রথম অধিকার হলো, জন্মের পর এমন একটি নাম রাখা, যা কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। নামই মানুষের প্রথম পরিচয় এবং ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক দায়িত্ব। মহান আল্লাহ কোরআনে বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা তাহরিম ৬)

এই আয়াতের আলোকে পরিবারের দায়িত্ব শুরু হয় মা-বাবা থেকেই। সন্তানের সঠিক লালন-পালন, চরিত্র গঠন এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ভিত্তি স্থাপন হয় জন্মের পর থেকেই। যদি মুসলিম সমাজ শরিয়তের নির্দেশিত নীতিমালা অনুসারে সন্তানদের শিক্ষা ও নামকরণ করে, নিজেদের বুদ্ধি ও রুচির চেয়ে আল্লাহর হুকুম ও নবীজি (সা.)-এর দিকনির্দেশনা মেনে চলে, তাহলে সেই সন্তানই ভবিষ্যতে হবে মা-বাবার চোখের শীতলতা, দুনিয়া ও আখেরাতের সম্পদ এবং চলমান সওয়াবের উৎস।

অন্যদিকে, যদি সন্তানদের নাম ও শিক্ষাদীক্ষা অনৈসলামিক চিন্তাভাবনা ও পরিবেশে গড়ে ওঠে, তবে পরিণামে সেই সন্তানের অপরাধ, গুনাহ ও অবাধ্যতার ভারে মা-বাবাও আল্লাহর কাছে দায়ী হবেন।

লেখক : মুদাররিস, জামিয়া নুরিয়া ইসলামিয়া কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত