আতঙ্কে চিকিৎসকরা, ব্যাহত হাসপাতালের সেবা

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৮ এএম

৫০ শয্যাবিশিষ্ট ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ময়মনসিংহ জেলার এই উপজেলায় চার লাখের বেশি মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা। কিন্তু চার দিন ধরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার করা একটি মামলাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফলে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জানা গেছে, গত ১২ নভেম্বর মানববন্ধন চলাকালে এনসিপি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার প্রধান সমন্বয়কারী মোজাম্মেল হকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১৪ নভেম্বর মোজাম্মেল হক বাদী হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জাকির হোসাইনকে প্রধান আসামি করে আরও ২১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জনকে আসামি করে ঈশ্বরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলার পর ডিউটিরত অবস্থায় হাসপাতালের একমাত্র নিরাপত্তাকর্মী শাকিল আহম্মেদকে (৩৮) আটক করায় কর্মীদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

গতকাল সোমবার সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু বিভাগ, অ্যানেস্থেসিয়া, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা, অর্থোপেডিকস ও সার্জারি এবং এনসিডি কর্নারসহ একাধিক কক্ষ তালাবদ্ধ ও জনশূন্য। মেডিকেল অফিসারের ২২ নম্বর কক্ষের সামনে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। স্বাস্থ্য পরিদর্শকের (ইনচার্জ) কক্ষও খালি পাওয়া যায়।

সবচেয়ে মানবেতর অবস্থা ছিল ইপিআই (টিকাদান) কক্ষের সামনে। সকাল থেকে শিশুদের নিয়ে অপেক্ষমাণ মায়েরা নিয়মিত টিকার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) ইলিয়াস খান গ্রেপ্তার আতঙ্কে কক্ষে না আসায় শিশুরা টিকা থেকে বঞ্চিত হয়। টিকা দিতে এসে খালি হাতে ফেরত যাওয়া শাহিনুর আক্তার ও রিনা বেগম বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছি টিকা দিতে। দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কেউ আসেনি। বাধ্য হয়ে টিকা না দিয়েই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।’

ইলিয়াস খান পরে বলেন, ‘ঘটনার দিন আমি টাইফয়েড ভ্যাকসিন কার্যক্রমে ব্যস্ত ছিলাম। তবুও শুনছি আমি মামলার আসামি। তাই গ্রেপ্তারের ভয়ে অফিস করতে পারছিলাম না।’ সাংবাদিকদের আশ্বাসে তিনি পরে কক্ষে এসে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেন। একই আতঙ্ক বিরাজ করছে নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীর মধ্যেও।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সুমাইয়া হোসেন লিয়া বলেন, ‘হাসপাতালের একমাত্র নিরাপত্তাকর্মী শাকিলকে ডিউটিরত অবস্থায় পুলিশ নিয়ে গেছে। এখন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা গ্রেপ্তার ও মামলায় হয়রানির ভয়ে আছেন। ফলে স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হলেও ইমার্জেন্সিসহ সব বিভাগ খোলা আছে। আমরা রোগীদের জন্য আমৃত্যু কাজ করে যাব। তবে বেশ কয়েকজনের নামসহ অজ্ঞাতনামা আসামি রাখায় আতঙ্ক আরও বেশি। ঘটনার দিন আমি ছুটিতে ছিলাম, তবুও শুনছি আমিও আসামি।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘ঘটনার দিন আমি টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন কর্মসূচিতে ব্যস্ত ছিলাম। ঘটনাটি হাসপাতালের বাইরে ঘটেছে এবং আমাদের কেউ জড়িত ছিল না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাকেই প্রধান আসামি করা হয়েছে এবং হাসপাতালের কয়েকজন স্টাফকে জড়ানো হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত আমার সব দাপ্তরিক কাজ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পরিচালিত হবে। নিরাপত্তাকর্মী আটকের পর পুরো হাসপাতাল অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।’

এ বিষয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানার ওসি মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যারা জড়িত নয়, তাদের আটক করা হবে না। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত