হাসিনার মৃত্যুদণ্ড: পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী?

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:৪৯ পিএম

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। মাত্র চার মাস সাত দিনের ব্যবধানে গতকাল সোমবার (১৭ নভেম্বর) ওই মামলার রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এই রায় মামলার শেষ ধাপ নয়; বরং এখান থেকেই শুরু পরবর্তী আইনি লড়াই।

মামলার গ্রেফতারকৃত আসামি ও অ্যাপ্রুভার—পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে রায়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর অক্টোবরে মামলাটি এখতিয়ারভুক্ত হয়। পুনর্গঠিত আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের এটাই প্রথম রায়। প্রথমে মামলার একমাত্র আসামি ছিলেন শেখ হাসিনা; পরে চলতি বছরের মার্চে আরও দুইজনকে যুক্ত করা হয়।

সোমবার ঘোষিত রায়ে পাঁচটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে বলে জানায় ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে তিন অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, আর বাকি দুটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড। পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে জুলাই ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এই ধাপের পরও রয়েছে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পথ।

২০১৩ সালের কাদের মোল্লা রায়ের পর যে গণআন্দোলনের সূত্র ধরে আপিলের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই বর্তমানে ১৯৭৩ সালের আইনে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যায়। আইন অনুযায়ী, যে কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন। একইসঙ্গে রাষ্ট্র ও অভিযোগকারী পক্ষও খালাস বা দণ্ড নিয়ে আপিল করতে পারে।

তবে একটি শর্ত রয়েছে—যদি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি পলাতক থাকেন, তাঁকে আগে আত্মসমর্পণ করতে হবে। পরে তাঁর আইনজীবী আপিল করতে পারবেন। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম বিবিসি বাংলাকে জানান, আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তার—যেকোনো অবস্থায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান আপিলের আইনগত অধিকার পাবেন।

আপিল বিভাগ চাইলে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রাখতে পারে, আবার প্রয়োজন মনে করলে সংশোধন বা বাতিলের সিদ্ধান্তও দিতে পারে। রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে, আর আইন অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি, অসঙ্গতি বা বিচ্যুতি থাকলে তা তুলে ধরে আপিল বিভাগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে।

আপিল বিভাগের রায়ের পর আবারও রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদনের সুযোগ থাকে। শুনানিতে আপিল বিভাগ নিজস্ব রায় বহাল, সংশোধন বা পুনঃশুনানির নির্দেশ দিতে পারে। এটিই মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ। পূর্বে জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম রিভিউতে খালাস পেয়েছিলেন—এ ধরনের খালাসের এটিই প্রথম নজির।

যদি রিভিউতেও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে, তখন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সামনে থাকে আরও একটি পথ—রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে দণ্ড মওকুফ, কমানো বা স্থগিত করার ক্ষমতা দেয়। অর্থাৎ আইনগতভাবে এটি শেষ মানবিক সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত