আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলের প্রতি সন্দেহ এবং অবিশ্বাস থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সৃষ্টি। মূলত এ অবিশ্বাস ছিল, গণঅভ্যুত্থানে বিতাড়িত আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং সরকারের। নিজের প্রতি যখন বিশ্বাস হারিয়ে যায়, তখন জনগণের রায়ের প্রতি সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক। সেই কারণে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ ২০১১ সালের ১০ মে বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় দেয়। ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়া সরকার ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে প্রণয়ন করে। মূলত ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কারণেই দেশের নির্বাচনী রাজনীতির ইতিহাসে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা কেয়ারটেকার সরকার ধারণার জন্ম। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ত্রয়োাদশ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে। এমন সরকারব্যবস্থা বাতিল করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় দেয় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার পর, ক্ষমতাসীন দলের অধীনেই ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে বিতর্ক রয়েছে। যে কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবির পুনর্জাগরণ হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ফেরানোর দাবি জানিয়ে আসছিল বিএনপি। গত ২০ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে শুনানি শেষে আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা পুনর্বহাল করে। আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেও, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। শুনানিতে আইনজীবীরা বলেছেন, আপিল বিভাগের রায়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হলেও এর প্রয়োগ ও তা কার্যকর হবে চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনের সময়। আপিল বিভাগে এ সংক্রান্ত রায়ের পর নিজ কার্যালয়ে রায়ের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেন, ‘ওনারা (আপিল বিভাগ) এটাকে প্রসপেক্টিবলি (ভবিষ্যৎমুখী) বলেছেন। অর্থাৎ, এটা কার্যকর হবে পরবর্তী সংসদ ভাঙার পরের ১৫ দিনের মধ্যে।’ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা হয়েছিল। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না বলে তা সাংবিধানিক হিসেবেই ঘোষিত হলো।’ অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশের মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পারবেন। দিনের ভোট রাতে হবে না। মৃত মানুষ ভোট দিতে যাবেন না। দেশ এ রকম একটি গণতান্ত্রিক মহাসড়কে চলা শুরু করল বলে মনে করি।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) রাজনৈতিক দলগুলো। তারা রায়কে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘রায়টি জনগণের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে এবং এতে ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’ এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের রায়কে স্বাগত জানান। তবে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল হওয়ায় আমরা খুব খুশি। পাশাপাশি সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তনের পর তা স্বকীয়তা, সাহস নিয়ে ফিরবে কি না এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।’ আমরা একে গণতন্ত্রায়নের পথে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে চাই। বিশেষ করে, নতুন প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টিকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে। মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে হলে এর বিকল্প নেই।
