সন্দেহে ১৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:১৭ এএম

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো হাউজ ফের মেরামতের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ভবনটি না ভেঙে শুধু শেড দিয়ে তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক)। অগ্নিকাণ্ডের সময় আগ্নেয়াস্ত্রসহ নানা সরঞ্জাম লুটের অভিযোগে এখনো তোলপাড় চলছে। আগুন লাগার সময় দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন সংস্থার ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছেন গোয়েন্দারা। তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইলও সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তদন্ত সংস্থাগুলো তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে কার্গো হাউজ মেরামতের কাজ সরকারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানকে দিতে চাপ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে দেশ রূপান্তর জানতে পেরেছে, গত ১৮ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো হাউজে আগুনে বিপুল পরিমাণ আমদানি পণ্য ভস্মীভূত হয়। আগুনের উৎস এবং গুদামের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে এখনো দোষারোপের প্রতিযোগিতা চলছে। কোন সংস্থা কার্গোর কোন অংশে দায়িত্ব পালন করত, তা রেজিস্টার খাতায় লেখা নিয়েও রহস্য দেখা দিয়েছে। ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকেও বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

অগ্নিকাণ্ডের পর ভল্ট ভেঙে ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, প্রায় এক লাখ গুলিসহ অন্যান্য মালামাল খোয়া যায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্ট্রং ভল্টে থাকা ২০৮ নম্বর কার্টনের আগ্নেয়াস্ত্রভর্তি ২১টি বাক্সের মধ্যে সাতটির হদিস এখনো মেলেনি। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় তিনটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এসব ঘটনার জেরে তোলপাড় চলছে। কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা বের করতে মরিয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। ঘটনার দিন কার্গো হাউজে যাদের ডিউটি ছিল, সেই রোস্টার বের করা হয়েছে। রোস্টারের সঙ্গে সিসি ফুটেজের স্থিরচিত্র মিলিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিমান, বেবিচকসহ কয়েকটি সংস্থার ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সন্দেহের তালিকায় নেওয়া হয়েছে। তাদের পূর্ণ প্রোফাইল সংগ্রহ করেছেন তদন্তকারীরা।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে ২৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে ভল্ট থেকে অস্ত্র-গুলি খোয়া যায় বলে তদন্তে বেরিয়েছে।

এদিকে কার্গো হাউজের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজনকে তলব করে চিঠি দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। সন্দেহভাজনরা চুরি কিংবা লুটের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকতে পারেন, আবার কারও কারও দায়িত্ব পালনে গাফিলতিও থাকতে পারে। তাদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আগুন লাগার আগে-পরে তারা কাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তা যাচাই করছে পুলিশের দুটি ইউনিট।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কার্গো হাউজের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ডিউটি রেজিস্টারে ‘সব ঠিক আছে’ লিখে একজন আরেকজনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতেন। কিন্তু রেজিস্টারে সব ঠিক থাকলেও ভল্টের তালা ভাঙা ছিল, অস্ত্র-গুলি ছিল না। তারা কেন এভাবে লিখেছেন, সেটি আমরা খতিয়ে দেখছি।

তিনি আরও জানান, দুই শিফটে কার্গো হাউজের বাইরের প্রধান গেটে দায়িত্বে ছিলেন বিমান সিকিউরিটির তাজিম খান। তার সঙ্গে ছিলেন পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। বিকেল ৪টা থেকে ভোর ৬টা ৪ মিনিট পর্যন্ত তারা কয়েক দফা ভল্ট পরিদর্শন করেছেন বলে রেজিস্টারে উল্লেখ আছে। ২৮ অক্টোবর সকাল ৭টায় দায়িত্ব গ্রহণকারী নিরাপত্তারক্ষী রফিকুল ইসলাম নোট দেন।

তদন্তে দেখা গেছে, ২৭ অক্টোবর বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন আটজন (বিমানের তিনজন, পুলিশের তিনজন, আনসারের দুজন) এবং রাত ১০টার পর নয়জন (বিমানের তিনজন, পুলিশের তিনজন, আনসারের তিনজন)। এসব তথ্যে অসংগতি পাওয়ায় গভীর তদন্ত চলছে। তবে অহেতুক কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন।

বিমান সূত্রের ভাষ্য, কুরিয়ার গোডাউনের নিরাপত্তা বা সুরক্ষার দায়িত্ব বিমানের নয়। কুরিয়ার সিকিউরিটি, সেফটি বা হ্যান্ডলিং-সংক্রান্ত কোনো বিধান বিমানের ইমপোর্ট কার্গো সিকিউরিটি প্রোগ্রাম বা কার্গো অপারেশন ম্যানুয়ালে নেই। কার্গো কমপ্লেক্সের বিমান-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কুরিয়ার গুদামের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও বিমানের নয়। ওই গুদাম বেবিচক কুরিয়ার সংস্থাগুলোকে ভাড়া দিয়েছে। তাই নিরাপত্তার দায় বিমানের ওপর বর্তায় না। তারপরও বিমান সার্বিকভাবে সহায়তা করছে। আমদানি কার্গো এলাকায় বিমানের ১২৮টি সিসিটিভি ক্যামেরায় সার্বক্ষণিক মনিটরিং হয়। সব ফুটেজ তদন্ত কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বেবিচক সূত্র জানায়, অগ্নিকাণ্ডে কার্গো হাউজের ব্যাপক ক্ষতির পর দ্রুত মেরামত ও পুনর্নির্মাণের কাজ শুরুর তোড়জোড় চলছে। ব্যবসায়িক ক্ষতি কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে দ্রুত কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে বেবিচক তৎপর। তবে মেরামতের কাজ একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দিতে সরকারের প্রভাবশালী এক ব্যক্তির ভাইয়ের পক্ষে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংস্থাটির এক কর্মকর্তা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভবন না ভেঙে আমরা শেড তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছি। বুয়েট থেকেও পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শেডের কাজটি একজন প্রভাবশালীর ভাইকে দিতে আমাদের ওপর চাপ আসছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী মাসেই কাজ শুরু হবে।’

তিনি আরও জানান, সন্দেহভাজন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে পক্ষপাতহীন ও দ্রুত তদন্ত চলছে। কার্গো হাউজ থেকে মালামাল চুরি বা খোয়া গেলেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এখনো মামলা করেনি। তবে বিমান কর্র্তৃপক্ষ দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং দায় অন্য সংস্থার ওপর চাপানোর প্রবণতা দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অবশ্য তদন্ত ভালোভাবেই এগোচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত