সাবেক প্রধান বিচারপতি হাজিরা দিচ্ছেন, ওনারা কেন নয়

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:১২ এএম

গুমের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সেনা কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল হাজিরা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার বলেছেন, ‘আইন সবার জন্য সমান।’ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জোরপূর্বক অপহরণ ও গুম করে নির্যাতনের অভিযোগের দুই মামলায় গতকাল রবিবার ১৩ সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের পরবর্তী ধার্য তারিখ থেকে ভার্চুয়াল হাজিরার আবেদন করেন আইনজীবী মাসুদ সালাউদ্দিন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি (সাবেক প্রধান বিচারপতি), আপিল বিভাগের বিচারপতিরা আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। সিনিয়র মন্ত্রীরা হাজিরা দিচ্ছেন। তারা যদি আসতে পারেন ওনারা (সেনা কর্মকর্তারা) কেন পারবেন না। আইন সবার জন্য সমান (ল ইজ ইক্যুয়াল ফর অল) তবে, আপনি যেহেতু আবেদন করেছেন শুনানি করতে পারেন। আমরা শুনব।’

গুমের দুই মামলার মধ্যে র‌্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে আটকে রেখে নির্যাতনের মামলায় আগামী ৩ ডিসেম্বর এবং সেনাবাহিনীর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন (জেআইসি) সেলে নির্যাতনের মামলায় ৭ ডিসেম্বর শুনানি হবে। দুই মামলাতেই প্রধান আসামি ক্ষমতাচ্যুত ও গণঅভ্যুত্থানে ব্যাপক হত্যাকান্ডে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গুম ও নির্যাতনের একটি মামলায় গতকাল যে ১০ জনকে হাজির করা হয় তারা হলেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম, এ ছাড়া আরেকটি মামলায় মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজহার সিদ্দিকীকে হাজির করা হয়।

আদালতে প্রসিকিউশনপক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম প্রমুখ। গতকাল সকাল ১০টার দিকে ‘বাংলাদেশ জেল প্রিজন ভ্যান’ লেখা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সবুজ রঙের একটি প্রিজন ভ্যানে সেনা কর্মকর্তাদের ট্রাইব্যুনাল এলাকায় আনা হয়। তাদের হাজিরাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালের আশপাশ এলাকায় সেনা সদস্য, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এর আগে গুমের দুটি মামলা ও গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা এলাকায় সংঘটিত হত্যাকা-ের ঘটনার একটি মামলাসহ তিনটি মামলায় গত ২২ অক্টোবর ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়ে পরবর্তী তারিখ ধার্য করে। রামপুরা হত্যাকান্ডের মামলায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলমকে আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার তারিখ ধার্য আছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় এ দুজন বিজিবিতে কর্মরত ছিলেন।

গত ৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিরোধী মত ও রাজনৈতিক লোকদের গুমের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দুই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ৩০ আসামিকে গ্রেপ্তার করে ২২ অক্টোবরের মধ্যে হাজির করার নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। গত ১১ অক্টোবর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়, ইতিমধ্যে ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাদের ১৪ জন বর্তমান সেনা কর্মকর্তা। একজন কর্মকর্তা অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (এলপিআর) আছেন। এরপর ১৩ অক্টোবর ঢাকা সেনানিবাসের একটি ভবনকে সাময়িকভাবে কারাগার ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

শেখ হাসিনার পক্ষে শুনানি করবেন জেড আই খান পান্না : গুমের দুই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে আইনি শুনানি করবেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। গতকাল ট্রাইব্যুনাল-১-এ হুইলচেয়ারে করে হাজির হয়ে তিনি শেখ হাসিনার পক্ষে শুনানি করার আরজি জানান। আদালত বলে আপনি (জেড আই খান পান্না) যদি শুনানি করতে চান আমরা অনুমতি দেব। এর আগে গত ১২ আগস্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় (ইতিমধ্যে শেখ হাসিনার মৃত্যুদ-ের রায় ঘোষিত হয়েছে) শেখ হাসিনার পক্ষে আইনি শুনানি করতে ট্রাইব্যুনালে আরজি জানান জেড আই খান পান্না। মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে যাওয়ায় ওইদিন একজন আইনজীবীর মাধ্যমে মৌখিকভাবে করা এ আবেদন নামঞ্জুর করে আদালত।

ট্রাইব্যুনাল ও বিচারকদের নিয়ে অবমাননাকর ছবি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও এর বিচারকদের নিয়ে অবমাননাকর ছবি, বক্তব্য ও মন্তব্য অবিলম্বে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল-১। সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নজরে আসার পর গতকাল বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল স্বতঃপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) হয়ে এ আদেশ দেয়। আদেশ বাস্তবায়ন করে তথ্য সচিব ও বাংলাদেশ টেলিযোগযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে আদালত। আদেশের সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়াারম্যান বলেন, ‘মুক্ত চিন্তার প্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে সবাই স্বাধীন। তবে সেটা হতে হবে দেশের প্রচলিত আইনের মধ্যে থেকে। সীমা অতিক্রম করা যাবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত