যশোরে ১০০ কোটির রস-গুড়-পাটালি বিক্রির টার্গেট 

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:৩২ পিএম

যশোরের ১০০ কোটি টাকা রস-গুড়-পাটালি বিক্রির টার্গেট চলতি মৌসুমে। শীতের আবহাওয়া শুরু হয় কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকে। আর এই শীত বয়ে আনে যশোরের যশ, খেজুরের রস' এর মৌসুম, যার সুখ্যাতি রয়েছে দেশ বিদেশে। 

ইতোমধ্যে যশোরের গাছিরা পুরোদমে নেমে পড়েছেন খেজুরের রস আহরণে। তারা আরও তিন সপ্তাহ আগে থেকে শুরু করেছেন প্রস্তুতি। সে সময় গাছের বাকল কেটে রস সংগ্রহের স্থান প্রস্তুত করেন। এখন গাছের প্রস্তুতকৃত স্থান সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে কেটে রস সংগ্রহ করছেন গাছীরা। খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন ঠিলে বা ভাড়-খুংগি-দড়া, গাছি দা, বালিধরা ইত্যাদির দামও বেড়েছে। 

পরদিন ভোর হতেই এক গাছ থেকে আরেক গাছ বেয়ে চলেছেন রস নামাতে। এরপর ব্যস্ততা বেড়ে যাচ্ছে বাড়ির নারীদেরও। তারা কড়াইতে রস জ্বালিয়ে তৈরি করছেন গুড়-পাটালি। একাজ করতে করতে তাদের সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। নিয়ম মেনে গুড়-পাটালি বানাতে গিয়ে দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না তারা। আবার কাচা রস খেতেও বেশ সুস্বাদু। রস দিয়ে বানানো হয় হরেক রকম পিঠা-পায়েশ। বাইরে থাকা আত্মীয়-স্বজনরাও মুখিয়ে থাকেন সেই স্বাদ পেতে। বাইরের অনেক আত্মীয়-স্বজনরা দাওয়াত পেয়ে থাকেন। 

যুগ যুগ ধরে চলা জেলার এ খ্যাতি প্রকাশে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যশোরের যশ, খেজুরের রস শীতের দিন মানেই যশোরের গ্রামাঞ্চলে খেজুর রস ও গুড়ের ভাগ, শীতের সকালে খেজুরের গুড়ের বিভিন্ন প্রকার পিঠা এবং পায়েস তো আছেই। প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাড়িতে চলছে খেজুরের রসের তৈরি খাদ্যের আয়োজন। ভোরে সংগ্রহ করা হয় খেজুরের রসের পানীয়। আবার কেউ কেউ ভিন্ন উপায়ে সংগ্রহ করে থাকে। তাই একটি আঞ্চলিক গানও প্রচলিত আছে ঠিলে হয়ে সে বট গাছ কাটতি যাবো, সন্ধ্যে ন এনে জাউ নেকে পাবো। 

যশোর কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বর্তমানে জেলার খেজুর গাছ রয়েছে ১৬ লাখ ২৫ হাজারের মতো। জেলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখা যায় সেতুর গাছ সাধারণত ক্ষেতের আইলে, রার পরে, নদী বা খালের পাড়ে হয়ে থাকে। আবার এক পতিত জমিতে খেজুরের বাগান রয়েছে। কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, যশোর অঞ্চলের মাটি সাধারণত বেলে দো-আঁশ আর পানিতে পাতা নেই। এর ফলে গাছের শিকড় অনেক নিচে পর্যন্ত যেতে পারে। সব মিলিয়ে যশোরের খেজুরের রস সুগন্ধি ও সুস্বাদু হয়ে থাকে।

মাহিরা জানিয়েছেন, কাঁচা রস তিলে বা ভাড় প্রতি (৩-৫ কেজি) ১৫০-২০০ টাকা বিক্রি হয়। ভালো মানের এক ভাড় গুড় বিক্রি হয় হাজার টাকায়। আর পাটলি কেজি প্রতি ৪০০-৫০০ টাকা। রস সংগ্রহ থেকে গুড়-পাটালি বানানো কাজটা বেশ কষ্টসাধ্য এবং সময় সাপেক্ষ। বাংলা সনের আশ্বিন মাসের (অক্টোবরের মাঝামাঝির পর থেকে) শুরু থেকে চৈত্র (মার্চ) মাস পর্যন্ত প্রায় মাস দাছি এবং গাছি পরিবারকে দিনের একটা উল্লেখযোগ্য এর পিছনে ব্যয় করতে হয়। অক্লান্ত পরিশ্রম করে মৌসুম শেষে গাছিদের আয়-রোজগার হয় বেশ ভালোই। 

যশোরে সবচেয়ে বড় সেতুর গুড়ের হাট বসে সদরের রূপনিয়া, বাঘারপাড়ার মণিরামপুর, কেশবপুর ও মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জে ব্যবসায়ীরা এসব হাট থেকে খেজুরের গুড় ও পাটালি কিনে সারা দেশে সরবরাহ করেন। এখনকার কারিগরদের পাটালি তৈরিতে সুনাম থাকায় খেজুরের গুড়-পাটালির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশের অন্যান্য জেলায়, এমনকি দেশের বাইরেও। যশোরের সুমানু এই গুড়-পাটালি অনেক সরাসরি গাছিদের কাছে অর্ডার নিয়ে পাইকারি মূল্যে কিনে দেশের বাইরেও সরবরাহ করে থাকেন। ক'বছর আগে থেকে অনলাইনে ব্যবসা এক করেছেন অনেকেই।

২০২২ সালে চৌগায়ার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বর্তমানে যশোরের অতিরিক্ত লো সুলতানা জানান, তিনি খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুড়ের মেলা, গাহিদের প্রশিক্ষণ, দাহি সমাবেশ, দাহিদের সমবায় সমিতি গঠন গোছ রোপণ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। একই বছর জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির জন্য যশোরের খেজুর গুড়ের আবেদন করেন তিনি। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সেটি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পায়।

গত ২ নভেম্বর সেতুর প্রতের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। চৌগাছা উপজেলার হায়াতপুর গ্রামে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ইউএনও শাহিনুর আক্তার। শনিবার (১৫ নভেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে সদর উপজেলার পতেঙ্গালী গ্রামের মাঠে শের গাছ কাটছিলেন এই মানের দাছি টিপু সুলতান। 

তিনি বলেন, আনর নিজস্ব কোন সেতুর গাছ নেই। গ্রামের কয়েকজনের কাছ থেকে দেড়শ লিঙ্গ নিয়েছি। লিজ বা বের করে দিয়েও মৌসুম শেষে দেড়শ গাছে লাখ দেড়েক টাকা মুনাফা থাকবে বলে আশা কৃষি অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন জানান, কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে নিরাপদ রস-গুড় উৎপাদনে কৃষকদের উৎস করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে গাছে কুপনে জয় বা ডিসের খোলা না রেখে শেডিং পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।  

এ লক্ষ্যে একটি প্রজেক্টও ইতোমধ্যে উপপরিচালক আরও জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যশের জেলায় ৩ কোটি ৭১ লাখ লিটার রাগ ও ২ হাজার ৭৪২ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজারদর অনুযায়ী রস ও গুড়ের বাজার দর প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাটালিগুড়ের মৌসুমে  বাংলা সনের ষড়ঋতুর মধ্যে পৌষ- মাঘ মিলে শীতকাল। এখন কেবল হেমন্তের শেষ মাস অগ্রহায়ণ শুরু। ষড়ঋতু হিসেবে শীতকাল আসতে আরও একমাস বাকি। তবুও পুরো শীতের আমেজ বিরাজ করছে যশোরে। শীতের আবহ শুরু হয় কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকে। আর এই শীত বয়ে আনে যশোরের যশ, খেজুরের রস' এর মৌসুম, যার সুখ্যাতি দেশময়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত