ঝটকা সামলে আবারও আকাশে ফিরছে এয়ারবাস এ৩২০

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:৪৬ এএম

বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত এয়ারবাস এ৩২০ সিরিজের উড়োজাহাজগুলো আজ সোমবার (০১ ডিসেম্বর) থেকেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ফ্লাইট পরিচালনায় ফিরছে। সফটওয়্যারে ধরা পড়া সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে হঠাৎ করে যে আপডেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল, তা এয়ারবাস আগের ধারণার চেয়েও দ্রুত শেষ করতে পেরেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী বোয়িংকে ঘিরে নিরাপত্তা বিতর্ক চললেও এবার আলোচনায় উঠে আসে এয়ারবাসের নিজস্ব একটি প্রযুক্তিগত দুর্বলতা।

এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র- সব অঞ্চলের এয়ারলাইনগুলো জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে এয়ারবাসের নির্দেশনা অনুসারে জরুরি সফটওয়্যার আপডেট সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাও বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করেছিল।

এ আপডেটের প্রয়োজন হয় জেটব্লুর একটি এ৩২০ উড়োজাহাজে আকাশে থাকা অবস্থায় তীব্র সূর্য বিকিরণ বা ‘সোলার ফ্লেয়ার’-এর প্রভাবে সফটওয়্যারে দুর্বলতা ধরা পড়ার পর। তবে কয়েকটি এয়ারলাইনের জন্য প্রক্রিয়াটি কিছুটা সময়সাপেক্ষ। উদাহরণ হিসেবে, কলম্বিয়ার অ্যাভিয়াঙ্কা ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত কিছু ফ্লাইটের টিকিট বিক্রি স্থগিত রেখেছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত সপ্তাহে। জেটব্লুর এ৩২০-এর হঠাৎ নিচে নেমে যাওয়ার একটি ঘটনায় সফটওয়্যার দুর্বলতার সম্ভাবনা দেখা দেয়—যদিও বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। এর পরপরই এয়ারবাস প্রায় ৬ হাজার এ৩২০ পরিবারের উড়োজাহাজ রিকল করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা পুরো ফ্লিটের প্রায় অর্ধেক।

নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে বৈঠকের পর এয়ারবাস গত শুক্রবার ৮ পৃষ্ঠার একটি নির্দেশনা পাঠায় শত শত অপারেটরের কাছে। এতে পরবর্তী ফ্লাইটের আগে সফটওয়্যার পরিবর্তন বাধ্যতামূলক করা হয়—যার ফলে বহু উড়োজাহাজ অস্থায়ীভাবে গ্রাউন্ডেড অবস্থায় পড়ে।

সৌদি বাজেট এয়ারলাইন ফ্লাইঅ্যাডিলের প্রধান নির্বাহী স্টিভেন গ্রিনওয়ে জানান, ‘জেদ্দা সময় রাত ৯টার দিকে বিষয়টি জানতে পারি। ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে আবার কাজে ফিরতে হয়। এত দ্রুত কাজ শেষ হবে ভাবিনি, কারণ সবসময়ই কিছু না কিছু জটিলতা থাকে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এয়ারবাসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও জরুরি রিকল। যুক্তরাষ্ট্রের থ্যাঙ্কসগিভিং ভ্রমণ মৌসুমে এটি বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি করেছিল।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ঘটনা এয়ারবাস ফ্লিটে সফটওয়্যার ট্র্যাকিংয়ের দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। কোন উড়োজাহাজে কোন সংস্করণের সফটওয়্যার চলছে—এ তথ্য সবসময়ই তাদের কাছে আপডেট নয়, কারণ এয়ারলাইনগুলোর রিপোর্টিংয়ে সময় লাগে।

শুরুর দিকে নির্দেশনায় নির্দিষ্ট সিরিয়াল নম্বর না থাকায় এয়ারলাইনগুলোর জন্য জানা কঠিন হয়ে পড়ে কোন উড়োজাহাজ আক্রান্ত। অনেক ফ্লাইট ছাড়তেও দেরি হয়। ফিনএয়ারের একজন যাত্রী জানান, তাদের ফ্লাইট রানওয়েতে চেকের কারণে সময় নেয়। তবে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় প্রকৌশলীরা দ্রুতই উড়োজাহাজভেদে সমস্যার তালিকা তৈরি করতে সক্ষম হন। অনেক এয়ারলাইন পরিকল্পনা অনুযায়ী কমসংখ্যক উড়োজাহাজে কাজ করতে পেরেছে। শুরুতে প্রতি উড়োজাহাজে তিন ঘণ্টার হিসাব থাকলেও পরে সময় অনেক কম লাগে।

এয়ারবাস  গত শুক্রবারের ঘোষণার পর আর কোনো মন্তব্য করেনি।

কীভাবে হয়েছে ত্রুটির সমাধান

সমাধান হিসেবে নাকের কোণ নিয়ন্ত্রণ করা সফটওয়্যারের আগের সংস্করণ পুনঃস্থাপন করা হচ্ছে। এজন্য ককপিটে ডেটা লোডার নামের একটি যন্ত্র নিয়ে গিয়ে কেবল সংযোগের মাধ্যমে সফটওয়্যার আপলোড করতে হয়। একই ডিভাইস সাইবার হামলা ঠেকাতেও ব্যবহৃত হয়।

একটি বড় এয়ারলাইনের এক নির্বাহী জানান, পর্যাপ্ত ডেটা লোডার না থাকায় তারা একসঙ্গে সব উড়োজাহাজে কাজ করতে পারেননি।

আরও জানা গেছে, এ৩২০ পরিবারের কিছু পুরোনো উড়োজাহাজে শুধু সফটওয়্যার নয়—পুরোনো কম্পিউটারই বদলাতে হচ্ছে। প্রথমে সংখ্যাটি প্রায় এক হাজার মনে করা হলেও পরে তা কমে আসে।

বোয়িং সংকটের পর নিরাপত্তায় নতুন মনোভাব

বিমান শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্সের দুই বড় দুর্ঘটনার পর যে জরুরি সংস্কার হয়েছে, এয়ারবাসের সাম্প্রতিক পদক্ষেপও তারই ধারাবাহিকতা।

বোয়িং তখন সফটওয়্যার সমস্যা সামাল দিতে দেরি করে তীব্র সমালোচনায় পড়ে। সেই অভিজ্ঞতার পর এবার এয়ারবাসও নজিরবিহীন খোলামেলা যোগাযোগ করছে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী গিয়োম ফোরি প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ করেন—যা সাধারণত বিমানের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল শিল্পে কম দেখা যায়।

নিউইয়র্কভিত্তিক জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান ৫ডব্লিউ পাবলিক রিলেশনসের চেয়ারম্যান রন তোতোসিয়ান বলেন, ‘বোয়িং ম্যাক্স সংকটের পরবর্তী প্রভাব মাথায় রেখেই এয়ারবাস কাজ করছে—এটা স্পষ্ট। কারণ বোয়িং দ্বিধা আর অস্বচ্ছতার জন্য বড় ক্ষতির মুখে পড়েছিল।’

তিনি আরও যুক্ত করেন, এয়ারবাস এখন দেখাচ্ছে—‘আমরা আরও ভালো করতে পারতাম’। এটি নিয়ন্ত্রক, গ্রাহক এবং যাত্রী—সব পক্ষের কাছেই ইতিবাচক বার্তা দেয়।

সূত্র: রয়টার্স

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত