আইজিপিসহ ফাঁসছেন ৮৭ শীর্ষ কর্মকর্তা

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:৫৭ এএম

আলোচিত পিলখানা হত্যাকা-ের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে রাঘববোয়ালদের নাম আসায় আলোচনা হচ্ছে দেশ-বিদেশে। তাদের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ করা বর্তমান পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ (আইজিপি) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান ও আওয়ামী লীগের নেতাসহ ৮৭ কর্মকর্তা ফেঁসে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে আইজিপি বাহারুল আলমকে নিয়ে অস্বস্তিতে আছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। নির্বাচনের আগে বা পরে তাকে আইজিপির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। তাছাড়া অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা করার পরিকল্পনা নিয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রটি বলছে, অভিযুক্তদের মধ্যে যারা দেশের বাইরে আছেন, তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে বিশে^র সর্বোচ্চ পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা চাইবে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের নামে সীমান্তরক্ষী এ বাহিনীর তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরণ আইনের মামলায় ১৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেয় আদালত। আরও ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। তবে ঘটনার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন তুলে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন ভুক্তভোগীরা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিডিআর হত্যাকা- নিয়ে তদন্তের দাবি ওঠে। পরে সরকার একটি কমিশন গঠন করে।

কমিটির প্রধান করা হয় মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানকে। পাঁচ মাস ধরে তদন্ত করে গত ৩০ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিডিআর হত্যাকা-ের সঙ্গে দলগতভাবে আওয়ামী লীগ জড়িত। এ ঘটনায় মূল সমন্বয় করেন ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। জড়িতদের রক্ষা করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল। তাছাড়া তৎকালীন সেনাপ্রধানেরও দায় রয়েছে এ ঘটনার। পুলিশ ও র‌্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও রয়েছে চরম ব্যর্থতা। তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, মন্ত্রণালয় বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। প্রতিবেদনের রিকমেন্ডেশনগুলো অবশ্যই বাস্তবায়ন করা হবে।

ইন্টারপোলকে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি : পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিডিআর হত্যাকা-ে আওয়ামী লীগ নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ৮৭ শীর্ষ কর্মকর্তা ফেঁসে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে একাধিক কর্মকর্তা চাকরিতে রয়েছেন। সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজন দেশে আছেন। আবার কয়েকজন দেশের বাইরে আছেন। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে, বাকিরা আত্মগোপনে রয়েছেন। তাছাড়া বর্তমান আইজিপির নাম আসায় আমরাও বিব্রতের মধ্যে আছি। নির্বাচনের আগে বা পরে তাকে সরানোর চিস্তাভাবনাও করা হচ্ছে। আবার তাকে কোনো দেশের রাষ্ট্রদূতও করা হতে পারে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, অভিযুক্তদের মধ্যে যারা দেশের বাইরে আছেন তাদের শনাক্ত করতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হবে। ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে ইন্টারপোলকে তালিকাসহ বিশেষ বার্তা পাঠানো হবে। হত্যাকাণ্ডের সময় দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন তারা।

যেসব নেতা ও কর্মকর্তা ফাঁসছেন : সূত্র জানায়, যারা ফেঁসে যাচ্ছেন তারা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, মাহবুব আরা গিনি, আসাদুজ্জামান নূর, তানজীম আহমেদ সোহেল তাজ, মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক (অব.), শাহীন সিদ্দিক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, মেহের আফরোজ চুমকি, লেদার লিটন (আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীর পুত্র), সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ, সাবেক নৌবাহিনীর প্রধান জহির উদ্দীন আহম্মেদ, এয়ার মার্শাল এসএম জিয়াউর রহমান, লে. জেনারেল সিনা ইবনে জামালী, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, লে. জেনারেল (অব.) মো. মইনুল ইসলাম, লে. জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল হাকিম আজিজ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল আলম চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইমামুল হুদা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহমুদ হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহবুব সারোয়ার, ডিজিএফআইর লে. (অব.) জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবর, লে. জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ, মেজর জেনারেল (অব.) ইমরুল কায়েস, মেজর জেনারেল (অব.) সুলতানুজ্জামান সালেহ উদ্দীন, এনএসআইয়ের মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মুনিরুল ইসলাম, মেজর জেনারেল (অব.) টিএম জোবায়ের, তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক হাসান মাহমুদ খন্দকার, মেজর জেনারেল (অব.) রেজানুর রহমান খান, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিম আহমেদ (তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক গোয়েন্দা-র‌্যাব)।

আইজিপিকে নিয়ে অস্বস্তি : পুলিশ সূত্র জানায়, পুলিশের বর্তমান আইজি বাহারুল আলমকে নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে সরকারের হাইকমান্ড। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে পুলিশের মধ্যেও। আইজিপির নাম আসার পরই প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিডিআর হত্যাকা-ের সময় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধানের দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠে এসেছে। গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০ নভেম্বর তাকে চুক্তিভিত্তিক আইজিপির নিয়োগ দেওয়া হয়। পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ‘দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা’র অভিযোগ তুলে তার নাম এসেছে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনের ১৪৬ নম্বর পয়েন্টের ‘গ’ অংশে পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তারা হলেন তৎকালীন আইজিপি নূর মোহাম্মদ, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার নাইম আহমেদ, তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি (এসবিপ্রধান) বাহারুল আলম, অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ এবং তার অধীন তদন্ত দল। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তদন্ত চলাকালে তৎকালীন এসবিপ্রধান বাহারুল আলম কমিশনকে অনুমাননির্ভর তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধী দলের কর্মীদের ফাঁসিয়েছেন। তাছাড়া মিছিলকারীদের শনাক্ত না করেই বিরোধীদলীয় কর্মীদের ওপর দায় চাপানো, মিছিলকারীদের শনাক্ত করেননি।

সাবেক পুলিশ কর্তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয় : ডিএমপির সাবেক কমিশনার নাইম আহমেদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার পর ক্রাইম সিন কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা, অপরাধীদের পলায়ন প্রতিরোধ করেননি। অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলামের বিষয়ে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় পাঁচ সেনা অফিসারকে ফাঁসানোর জন্য ডিজিএফআইকে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ ও তদন্ত কাজে অসহযোগিতা করেছেন। অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দের বিষয়ে বলা হয়, নারী ও শিশুদের শারীরিক, মানসিক নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় মামলা না করা এবং সাক্ষী থাকা সত্ত্বেও অভিযোগপত্র দাখিল করেননি। সাক্ষী পাওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগ ব্যক্তিদের নাম অভিযোগপত্রে যুক্ত না করা, মোবাইল ফোন সিডিআর সংগ্রহ করে প্রযুক্তিগত সাক্ষ্য-প্রমাণ অভিযোগপত্রে উপস্থাপন না করা, সেনা অফিসারদের খুন, ঘটনার আলমত ধ্বংস এবং পলায়নের সুযোগ দানকারীদের বিষয় তদন্ত না করা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ না করা, বিরোধীদলীয় নিরীহ নেতাকর্মীদের মামলায় ফাঁসিয়ে সাজা প্রদানের ব্যবস্থা করা ও কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য না দিয়ে অসহযোগিতা করেছেন।

৮২৭ ভারতীয় নাগরিকের বাংলাদেশে প্রবেশ : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ২৪ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮২৭ জন ভারতীয় পাসপোর্টধারী এবং বিদেশি পাসপোর্টধারী ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তাদের মধ্যে ৬৫ জনের বাংলাদেশ থেকে বহির্গমনের তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে ওই তারিখের মধ্যে ১ হাজার ২২১ জনের বহির্গমনের তথ্য ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে থাকলেও, তাদের মধ্যে ৫৭ জনের আগমনের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। বিষয়টি রহস্যজনক বলে বলা হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদও বলেছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পিলখানা আক্রমণ করলে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করত এবং আর ফিরে যেত না। বিএসএফের সঙ্গেও ভারতে আশ্রয়ের জন্য অনেক বিডিআর সদস্যের যোগাযোগ হয়েছিল। পুলিশ ও র‌্যাব তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী স্বপ্রণোদিত হয়ে যেকোনো ক্রাইম সিন সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু বিডিআর হত্যাকা-ে সন্দেহাতীতভাবে জানতে পেরেও বাহিনীর সদস্যরা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এরকম জাতীয় ক্রান্তিকালে স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজস্ব কর্মকা- চালানোর জন্য পুলিশ ও র‌্যাবকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে বলা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত