‘আধমরা’ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে ডেকেছেন প্রধান উপদেষ্টা

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০৭ এএম

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবসের’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় বিএসএমএমইউর একটি অডিটরিয়ামে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২ ফেব্রুয়ারির এ আয়োজনে অনুষ্ঠানটিতে আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা ছিল ৩০০ জন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সে সময়ের সচিবসহ অন্যান্য যেসব অতিথি ছিলেন তাদের দুপুরের খাবার হিসেবে ভাত, মুরগি এবং রুই মাছ সরবরাহ করেছিল নওরিশ ল্যাব নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যেটি ওই হাসপাতালে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করে। তবে দুপুরের যে খাবার প্রতিষ্ঠানটি সরবরাহ করেছিল তার পুরোটাই ছিল পচা এবং বাসি। যে কারণে কোনো অতিথিই এই খাবার খেতে পারেননি এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়লের কর্মকর্তারা ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

এটাই নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বর্তমান অবস্থা। বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়েছে, আধমরা এই প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ খাবারের নিশ্চয়তা নিয়ে কাজের কথা বললেও আসলে কিছুই করতে পারছে না। যেখানে প্রতিনিয়তই গবেষকরা বলছেন, হেভিমেটাল, কীটনাশকের অযাচিত ব্যবহার, অ্যান্টিবায়োটিকের রেসিডিউসহ প্রতিদিনের খাদ্য বিষাক্ত হয়ে উঠছে। যার প্রমাণ মেলে সম্প্রতিক গবেষণায়। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন জরিপে উঠে এসেছে, দেশের প্রায় প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে চারজনের রক্তেই ‘উদ্বেগজনক’ মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে। এতে বলা হয়, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ শতাংশের (অর্থ্যাৎ প্রায় প্রতি ১০ জনে ৪ জন শিশু) এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রায় ৮ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা ‘নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি’। এই গবেষণায় ১১ হাজার রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। রক্তে সিসার উপস্থিতির কারণটি খাদ্য হলেও এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো মৌলিক কাজ বা গবেষণা নেই। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিনিয়তই আরও বেশি অকার্যকর হয়ে উঠছে।

প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৭১৩টি নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৪২টি নমুনা মানসম্মত পাওয়া গেলেও বাকি ৫৭১টি নমুনার ফলাফলে ভেজাল পাওয়া যায়। অর্থাৎ মোট নমুনার প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্যই মানবর্হিভূত। কিন্তু এই ৫৭১টি বা ৩০ শতাংশ মানবহির্ভূত নমুনার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো জোরালো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। শুধু একটি করে চিঠি ধরিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি আহমেদ ফুডসহ অন্য আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের কেওড়া ও গোলাপজল বাজার থেকে প্রত্যাহারের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। তবে এসব পণ্য এখনো বাজারে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েই দায় সেরেছে। অথচ এ পণ্যগুলোর মধ্যে এমন রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে যা ডায়ালাইসিসের সময় ব্যবহার করা হয়। একইভাবে বিভিন্ন গবেষণায় অর্থায়ন করেও যখন কোনো খাদ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি তার দায় নিচ্ছে না।

এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। আজ একটি উচ্চপর্যায়ের সভা ডাকা হয়েছে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাতে। যেখানে প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা। খাদ্যে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিক পদার্থ, হেভিমেটাল, কীটনাশক রেসিডিউ, তেজস্ক্রিয়তা, অ্যান্টিবায়োটিকের রেসিডিউ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। যেখানে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সচিব এবং কয়েকটি সংস্থার প্রধানদের ডাকা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই গলদ নিয়ে চলছে। কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যান জাকারিয়া, প্রায় ১ বছর ৮ মাস ধরে কর্মরত। তিনি পড়াশোনা করেছেন পদার্থবিজ্ঞানে। এর আগে চেয়ারম্যান ছিলেন মো. আব্দুল কাইউম সরকার, তার পড়াশোনা বিবিএতে। তিনি একটা লম্বা সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ৯ নম্বর ধারায় বলা আছে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হতে হলে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে কমপক্ষে ২৫ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা  প্রয়োজন। অথচ সরকার এটি প্রতিপালন করছে না। বরং এই প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ডাম্পিং জোন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। যে কারণে আইনে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির অনুশীলনের কথা বলা হলেও দিন দিন সেটা হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু চেয়ারম্যান নয়, কর্তৃপক্ষের সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও আইন মানা হচ্ছে না। ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সদস্য নিয়োগের বিধান থাকলেও চারজনের মধ্যে বরাবরই দুজন সদস্য নিয়োগ হয় এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে। অথচ দেশের ১৮ কোটি মানুষের খাদ্যের নিরাপদতা দেখভাল করার জন্যই প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম শুরু করেছিল ২০১৫ সালে।

জানা গেছে, কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন সচিব পদে পদোন্নতির দিন গুনে। খাদ্য উপদেষ্টার আনুকূল্য পেতে উপদেষ্টার এপিএসকে একটি গাড়ি বরাদ্দ দিয়েছেন, যার জ্বালানি, ড্রাইভার থেকে শুরু করে সব খরচ কর্তৃপক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে।

পদক্রম অনুসারে চেয়ারম্যানের পরের পদ হলো সদস্য। কর্তৃপক্ষের মোট সদস্য চারজন। এর মধ্যে দুজন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে আসে এবং বাকি দুজন সরকারের যুগ্ম সচিব পদের কর্মকর্তা। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-তে সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে ২০ বছরের নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ থাকলেও শেষের দুজন নিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তবে তা কখনোই প্রতিপালন করা হয় না। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরপরই সদস্য হয়ে আসেন মো. দিদারুল ইসলাম। যোগদানের তিন মাসের মাথায় তিনি অধিকতর ভালো জায়গায় বদলি হয়ে যান। এরপর ২০১৮ সালের নিশিভোটের দুই ডিসি মো. ওয়াহিদুজ্জামান ও মাহমুদুল কবির মুরাদকে সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। চার মাস না যেতেই তারা দুজনই ওএসডি হন। একই সময় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে পরিচালক হিসেবে আসেন কাজী নাহিদ রসুল। কিন্তু দুই মাসের মাথায় ২৪-এর নির্বাচনে ডিসি থাকার অপরাধে তিনিও ওএসডি হয়ে যান। বর্তমানে তার জায়গায় দায়িত্ব পালন করছেন শামীম আহমেদ, যিনি বিগত সরকারের আমলে নাটোর ও রাজশাহী জেলার জেলা প্রশাসক ছিলেন এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ ৫ আগস্টের পর কর্তৃপক্ষের ওপরের দিকের পদগুলোয় যাদেরই পদায়ন করা হয়েছে, তারা সবাই আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী আমলা। তাদের শাস্তিমূলকভাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে পদায়ন করা হয়। ৫ আগস্টের পর গত ১৫ মাসে প্রতিষ্ঠানটিতে দুটি সদস্য পদে অন্তত সাতবার রদবদল হয়েছে।

যার প্রভাব গিয়ে পড়ছে কর্তৃপক্ষের নিয়মিত কর্মকর্তাদের ওপর। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাংগঠনিক কাঠামো অনুসারে, প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব মোট জনবল ৩৭৪ জন। এর মধ্যে কর্মকর্তার সংখ্যা ১২৯। অর্থাৎ ১৮ কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব মাত্র ১২৯ জন কর্মকর্তার হাতে। সোয়া ১৩ লাখ জনগণের খাদ্য নিরাপদ করার জন্য গড়ে মাত্র একজন কর্মকর্তা! নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের জনবল বাড়ানোর জন্য ২০২২ সালে একটি প্রস্তাবনা জনপ্রশাসনে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ পদ সৃজনের রূপরেখা প্রদান করা হয়। কিন্তু ১ হাজার ৮০০ পদের মধ্যে শুধু ৮টি নতুন পদ সৃজনের জন্য অনুমোদন করা হয়। জনপ্রশাসন কর্তৃক সৃজিত ওই ৮টি পদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতির জন্য বিগত তিন বছরেও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

বর্তমানে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ চলছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। অথচ অন্যান্য দেশে এই ধরনের কর্তৃপক্ষ সাধারণত স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গেই সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, যা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। কানাডিয়ান ফুড ইন্সপেকশন এজেন্সি দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন। আবার ভারতের নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি দেখভাল করে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি অব ইন্ডিয়া, যা সে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে তাদের কাজের জন্য জবাবদিহি করে। থাইল্যান্ডের থাইল্যান্ড ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, শ্রীলঙ্কার নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের বিষয়টি দেখভাল করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থাগুলো।

সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন খাদ্য অধিদপ্তর ধান, চাল, গম সংগ্রহ, মজুদ ও বিক্রয় করে। সেখানে একই মন্ত্রণালয়ের অধীন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কতটুকু তাদের (খাদ্য অধিদপ্তর) কার্যক্রমকে মনিটরিং করতে পারবে, কিংবা আদৌ করে? প্রতিষ্ঠানটিকে ক্ষমতায়ন করার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতা থেকে সরিয়ে নেওয়ারও দাবি উঠেছে।

এ বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে চিঠি দিয়ে বিশেষ সভার কথা জানানো হয়েছে। সভায় আমাদের কাজ নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরব।

তিনি বলেন, ‘শিশু ও অন্তঃসত্ত্বাদের রক্তে সিসার দূষণ কীভাবে হয়েছে তার মূল খুঁজতে ইউনিসেফ আমাদের একটি প্রস্তাব দিয়েছে। সেটি নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রাথমিক একটি আলোচনায় আমরা ৩ হাজার ৪০০ খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করতে চাচ্ছি পাঁচ মাসের মধ্যে। যদিও এটি এখনো অনুমোদন হয়নি।

তিনি জানান, পরিবেশ বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় ১০ বছরের পরিকল্পনা করেছে। যেখানে লেড ফ্রি বাংলাদেশের জন্য কার্যক্রম শুরু করা হবে। যেটা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এখানেও বিএফএসএ কাজ করবে।

২ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় ক্ষুব্ধ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের শান্ত করতে বিএফএসএর চেয়ারম্যান জাকারিয়া সপ্তাহখানেক পর হাড়ি গোশত নামের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে ১৫০ প্যাকেট খাবার খাইয়ে দায় মিটিয়েছিলেন। এবার এই আধমরা প্রতিষ্ঠানের ভাগ্য নির্ধারণে সভা ডেকেছেন প্রধান উপদেষ্টা। চেয়ারম্যান বা প্রতিষ্ঠানের ভাগ্য নির্ধারণ হবে এই সভায়। প্রতিষ্ঠানটি খাদ্যের সঙ্গেই থাকবে, না অন্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় যাবে, সেটাও নির্ধারণ হতে পারে এ সভাতেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত