পরিচয় শনাক্তে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের মরদেহ রায়ের বাজার কবরস্থান থেকে উত্তোলন শুরু হয়েছে। পরিচয়হীন ১১৪টি মরদেহের মধ্যে দুইটি মরদেহ উত্তোলন করে মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পুনরায় কবর দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। এদিন তাদের পরিচয় শনাক্তে সাতটি পরিবারের এগারো জন্য সদস্যের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে বাকিগুলো উত্তোলন করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য রায়ের বাজার কবরস্থানেই একটি অস্থায়ী ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। এর আগে গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর রায়ের বাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ-সংলগ্ন কবরস্থানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শাহাদতবরণকারী ১১৪ জন অজ্ঞাত শহীদের পরিচয় শনাক্তে মরদেহ তোলা শুরু করেছে সিআইডি।
এ সময় সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ উপস্থিত থেকে মরদেহ উত্তোলন কার্যক্রম শুরু করেন। উত্তোলন কার্যক্রম শুরুর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে ছিবগাত উল্লাহ বলেন, আনাসের মতো যারা বুকের রক্ত ঢেলে দেশের জন্য রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাদের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। এই কবরস্থানে যারা নাম-পরিচয়হীন অবস্থায় শুয়ে আছেন তাদের পরিচয় তখন যাচাই-বাছাই করা হয়নি। তাদের পরিচয় উদঘাটন করা জাতির কাছে আমাদের একটি দায়িত্ব। আজ সেই মহান কাজের সূচনা হলো। এ সময় তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের মরদেহ রায়ের বাজার কবরস্থান থেকে আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনেই উত্তোলন করা হবে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার (ইউএনএইচআর) মাধ্যমে আর্জেন্টিনা থেকে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ লুইস ফন্ডি ব্রাইডার ঢাকায় এসে পুরো কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি গত ৪০ বছরে ৬৫টি দেশে একই ধরনের অপারেশন পরিচালনা করেছেন।
সিআইডি প্রধান আরও বলেন, মিনেসোটা প্রোটোকল অনুসরণ করে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন, পোস্টমর্টেম, ডিএনএ স্যাম্পলিংসহ প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হবে। আমরা সিটি করপোরেশন, ঢাকা মেডিকেল, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ডিএমপি, বিভাগীয় কমিশনারসহ সব স্টেকহোল্ডার প্রশিক্ষণ দিয়েছি। কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন থেকে পুনঃদাফন পর্যন্ত নির্দিষ্ট ধাপ সব কার্যক্রম করা হবে জানিয়ে সিআইডি প্রধান বলেন, আবেদন অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ১১৪টি কবর চিহ্নিত হয়েছে, যা বাস্তবে কমবেশি হতে পারে। মরদেহ উত্তোলনের পর পোস্টমর্টেম, বোন স্যাম্পল/টিস্যু সংগ্রহ, ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হবে। পরিচয় নিশ্চিত হলে ধর্মীয় সম্মান বজায় রেখে আবার পুনঃদাফন করা হবে। পরিচয় শনাক্তের পর কেউ যদি মরদেহ গ্রহণ করতে চান তাহলে গ্রহণ করতে পারবেন যোগ করেন তিনি।
এখন পর্যন্ত কত জন মরদেহের জন্য আবেদন করেছেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ১০ জন স্বজন আবেদন করেছেন, আরও কেউ থাকলে সিআইডিতে যোগাযোগ করতে পারবেন। সিআইডি হটলাইনে যোগাযোগ করলে স্বজনদের ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করা হবে। তিনি বলেন, আমরা জানি না কোন কবরে কে আছেন। তাই সময় কত লাগবে বলা সম্ভব নয়। তবে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই প্রক্রিয়ায় সব শহীদের পরিচয় আমরা বের করতে পারব।
সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে সিআইডি প্রধান সাংবাদিকদের অনুরোধ করে বলেন, আন্তর্জাতিক প্রোটোকল অনুযায়ী মরদেহের কোনো ছবি বা সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। এটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট কাজ। আপনাদের আগের মতোই সহযোগিতা চাই।
পরিবারদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক বাবা-মা, ভাই–বোন বছর ধরে ঘুরে বেড়িয়েছেন তাদের আপনজনদের পরিচয় জানার জন্য। আমরা চাই, এই জাতীয় বেদনার দায় থেকে দেশকে মুক্ত করতে।
এ সময় ইউনাইটেড ন্যাশনস হাইকমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস (ইউএনএইচআর) আর্জেন্টিনার আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ লুইস ফন্ডি ব্রাইডার বলেন, আমি গত তিন মাস ধরে সিআইডির সঙ্গে কাজ করছি। আন্তর্জাতিক মানের এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি এ কাজ আন্তর্জাতিক ফরেনসিক মানদ- ফলো করে করা হবে। আন্তর্জাতিক রুলস ফলো করে আমরা লোকাল সংস্থা (সিআইডি) কে সহায়তা করব।
এ প্রসঙ্গে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, পরিচয় শনাক্তে আজ সকাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মরদেহগুলো উত্তোলন শুরু হয়েছে। ১১৪টি মরদেহের মধ্যে দুইটি মরদেহ উত্তোলন করে মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পুনরায় কবর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাতটি পরিবারের এগারো জন্য সদস্যের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ধাপে ধাপে পর্যায়ক্রমে কাজটি করা হবে।
গত বছর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় নিহত ১১৪ জন শহীদকে অজ্ঞাত পরিচয়ে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। গত ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহিদুল ইসলামের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ১১৪টি মরদেহ উত্তোলনের নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নিহত অজ্ঞাত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুলিশের আবেদনে বলা হয়, ‘ভবিষ্যতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য সঠিক আইনগত প্রক্রিয়ায় মরদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ জরুরি।’
আবেদনে আরও বলা হয়, ‘ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে হস্তান্তর করাও প্রয়োজন।’
প্রসঙ্গত, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে টানা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে। অহিংস এই আন্দোলন সহিংস হয় ১৫ জুলাই থেকে। পরে তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই গণঅভ্যুত্থান এ সর্বস্তরের ছাত্রজনতা অংশ নেয় এবং সহিংস ঘটনার কারণে সরকারি গেজেট অনুযায়ী, ৮৩৬ জন শহীদ হন। এই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ আবার স্বাধীনতার স্বাদ ফিরে পায়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর গত বছরের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালান স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। তবে এতদিন পরও জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত অনেকের মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
