অসৎ দল মালিকরাই দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:১৯ এএম

ইংল্যান্ডের পুলিশ বাহিনীতে দীর্ঘ কর্মজীবন, পেয়েছেন রাণীর দেওয়া সম্মাননা পদকও। এরপর আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক। সাকিব আল হাসান যখন বাজিকরের একাধিক প্রস্তাব পেয়েও সময়মতো দুর্নীতি দমন বিভাগকে অবহিত না করে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হলেন, সে সময় আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ছিলেন অ্যালেক্স মার্শাল। তাকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তাদের দুর্নীতি দমন বিভাগের পরামর্শক করেছে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ১২তম আসর শুরুর আগে এই আসরকে স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও দুর্নীতিমুক্ত রাখার অভিপ্রায় জানিয়ে নিজেদের কর্মপরিকল্পনার কিছুটা জানিয়েছেন মার্শাল। সেইসঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, অতীতের অব্যবস্থাপনা আর চলবে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে গুলশানের নাভানা টাওয়ারে অবস্থিত বিসিবির সাবেক কার্যালয়, যা বর্তমানে বিভিন্ন তদন্ত বা ট্রাইব্যুনাল চলাকালে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, সেখানেই সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন মার্শাল। শুরুতেই নাতিদীর্ঘ বক্তব্যে মার্শাল জানিয়েছেন, বিপিএলে কোথায় কোথায় কীভাবে দুর্নীতি দমন নীতিমালার লঙ্ঘন হয়েছে এবং আগামী আসরগুলোতে কোথায় কোথায় প্রতিকার দেখতে চান। মার্শাল বলেন, ‘আমার নাম অ্যালেক্স মার্শাল। আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নতুন ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের স্বাধীন চেয়ারম্যান। সম্ভবত আপনাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে একটি ভিডিওতে দেখেছেন, যেটি সাম্প্রতিক সময়ে প্রচারিত হয়েছে এবং আমি আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই সেটির জন্য। এই সভাটির উদ্দেশ্য হলো, আসন্ন বিপিএল ১২-এর জন্য আমাদের প্রস্তুতি ব্যাখ্যা করা। এটি এখন খুব কাছেই। আপনারা জানেন, এটি একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। এতে জড়িত আছে নতুন ইন্টিগ্রিটি ইউনিট, গভর্নিং কাউন্সিল, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং সব দল মালিকরা, কোচ, ম্যানেজার এবং সব খেলোয়াড় এবং গণমাধ্যমকেও একটি উচ্চ মানের ও পরিচ্ছন্ন ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজনে আমাদের সাহায্য করতে হবে। বিপিএল বিশ্ব ক্রিকেটের শীর্ষস্থানীয় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর মধ্যে একটি হওয়া উচিত ছিল। এটির উচিত ছিল সেরা খেলোয়াড়দের আকর্ষণ করা এবং এটির উচিত ছিল বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সেই শীর্ষ স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উন্নীত করতে সাহায্য করা। এই ধরনের ঘটনাই আমার মনে আছে এবং যখন আমি আমার কাজ করি, আমি সর্বদা অনুভব করি যে আমি বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের জন্য কাজ করছি। তারা আমার গ্রাহক। তারা একটি উচ্চ মানের এবং পরিষ্কার ইভেন্ট চায়। আমরা যে নীতির ওপর কাজ করছি, তা হচ্ছে প্রতিরোধ সর্বদা নিরাময়ের চেয়ে উত্তম। এই বছরের বিপিএল যাতে ভালোভাবে পরিচালিত হয় এবং একটি পরিষ্কার ইভেন্ট হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’

বিপিএলের অতীত আসরগুলোতে দুর্নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মার্শাল বলেন ‘আমাদের সবাইকে মেনে নিতে হবে যে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ইভেন্টের সঙ্গে কিছু নেতিবাচক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। আর এর একটি ফলাফল ছিল স্বাধীন তদন্ত কমিটি, যারা গত মাসে প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে আমার কাছে ৯০০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছে। সেই প্রতিবেদনে ৬০ জন ব্যক্তিকে সাক্ষী বা সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আমি আমার নতুন নৈতিকতা ও দুর্নীতি দমন দলের (ইন্টিগ্রিটি ইউনিট) সঙ্গে সেই প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করছি। এই পুরো ইন্টিগ্রিটি ইউনিটটি বিসিবির মধ্যে একটি নতুন কাঠামো এবং আমার নতুন সহকর্মীরা যে প্রাথমিক ধারণা তৈরি করেছেন, তাতে আমি খুবই সন্তুষ্ট। নতুন ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের আমাদের দুটি মূলনীতি আছে : পেশাদারিত্ব এবং গোপনীয়তা।’

আগের আসরে নিয়মবহির্ভূতভাবে সংরক্ষিত এলাকায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছেন মার্শাল, যা এবার একেবারেই বরদাশত করা হবে না বলে জানিয়েছেন, ‘আমি চাই, প্রতিরোধের অংশ হিসেবে, আগের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া হোক এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে, এমন কয়েকটি ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে পরিস্থিতি যেমন হওয়া উচিত ছিল, তেমন হয়নি। এর মধ্যে একটি হলো, যা প্লেয়ার অ্যান্ড ম্যাচ অফিশিয়ালস এরিয়া বা সংক্ষেপে পিএমওএ নামে পরিচিত, সেটির নিয়ন্ত্রণ। পিএমওএ হলো সেই এলাকা যেখানে খেলোয়াড়, ম্যাচ অফিশিয়াল এবং কোচদের ম্যাচের সময় সুরক্ষিত রাখা হয়। তাদের সব মোবাইল ফোন জমা দিতে হয়, কোনো যোগাযোগ করা যায় না, কোনো স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করা যায় না, যখন তারা পিএমওএতে থাকে, তখন কিছুই নয়। অর্থাৎ, মাঠে পৌঁছানোর মুহূর্ত থেকে শুরু করে ম্যাচের শেষ বলটি হওয়া পর্যন্ত, পিএমওএর ভেতরে কোনো যোগাযোগ থাকা উচিত নয়। দু-একটি ব্যতিক্রম আছে, যেমন একজন ডাক্তারের জরুরি চিকিৎসার জন্য হয়তো ফোন লাগতে পারে। একজন মিডিয়া ম্যানেজার হয়তো ফোন বহন করতে পারে, তবে শুধু অনুমোদিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে এবং টিম ম্যানেজার হয়তো একটি ফোন রাখতে পারেন, কিন্তু তারা শুধু সেই ম্যাচ সম্পর্কিত টিম-সংক্রান্ত কাজের জন্য এটি ব্যবহার করতে পারেন। ব্যক্তিগত বা সামাজিক যোগাযোগ বা অন্য কিছুর জন্য নয়।’

মার্শাল আরও জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ম্যাচ গড়াপেটা বা স্পট ফিক্সিংয়ের মতো কাজে যেসব সংকেত ব্যবহার করা হয় সবই তার জানা। তাই এসব আচরণের ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা দিয়ে রাখলেন, ‘তারা ম্যাচে বেটিং করছে, তখন দুর্নীতিবাজরা জানে যে নিয়ম লঙ্ঘন হতে চলেছে। উদাহরণ স্বরূপ, কোনো খেলোয়াড় হয়তো সম্মত হতে পারে, ‘যদি দেখেন আমি ওভারের দ্বিতীয় বলে একটি ওয়াইড বল করি, তাহলে সেটিই হবে আমার সংকেত।’ অথবা, যদি আমি হঠাৎ করে আমার ব্যাটের হাতলের রঙ হলুদ থেকে গোলাপি করে ফেলি, তবে সেটি একটি সংকেত। সারা বিশ্বে ব্যবহৃত বেশিরভাগ সংকেত সম্পর্কে আমি জানি, যে শব্দগুলো দুর্নীতি দমন কোড লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়।

সুতরাং, আপনারা এই নীতির খুব কঠোর প্রয়োগ দেখতে পাবেন। আপনারা পিএমওএ নিয়মাবলির প্রতি খুব কঠোর আনুগত্য দেখতে পাবেন। তবে কোনো সন্দেহ নেই, যারা গত কয়েকটি ইভেন্টে দুর্নীতি দমন কোড লঙ্ঘন করতে পেরেছে, তারা আজকেও হয়তো ভাববে যে তারা এই বছরের ইভেন্টেও আবার এটি লঙ্ঘন করতে পারবে। আর আমি আমার শুরুর কথায় ফিরে যাচ্ছি। আমাদের একটি সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে গণমাধ্যম, দুর্নীতি দমন ইন্টিগ্রিটি ইউনিট, বোর্ড সদস্যরা, গভর্নিং কাউন্সিল, খেলোয়াড়রা, দলের মালিকরা এবং দলের ব্যবস্থাপনা তা নিশ্চিত করার জন্য যে, এই খারাপ মানুষগুলো যেন আমাদের ইভেন্টে প্রবেশ করতে না পারে।’

বেহুলা লক্ষ্মীন্দরের লৌহ বাসরঘরেও ছিদ্র ছিল, সেই ছিদ্র দিয়ে ঢুকে যায় প্রাণঘাতী কালসাপ। বিসিবির দুর্নীতি দমনের যে নিরাপত্তা চাদর, তাতেও ছিদ্র হতেই পারে। মার্শাল সেটাই বললেন যে, রক্ষক যদি ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তাহলে নিরাপত্তা দেওয়া কঠিন, ‘আপনি সারা বিশ্বে দেখেন, যেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টগুলো খারাপ পথে যায়, খুব প্রায়ই এটি আসে দলের খারাপ মালিকদের মাধ্যমে, যারা এমন লোকদের ভেতরে আসার অনুমতি দেয়, যারা পরে দুর্নীতি দমন কোড ভঙ্গ করে। তাই, আমি খুবই আগ্রহী, আমি মালিকদের এমন লোকদের মধ্যে উল্লেখ করেছি যাদের নিশ্চিত করা দরকার যে, এই ইভেন্টটি পরিষ্কার এবং সফল হবে। তাদের সবাইকে খতিয়ে দেখা হবে। তাদের জন্য যারা কাজ করেন, তাদের প্রত্যেককে খতিয়ে দেখা হবে এবং টাকা কোথা থেকে আসছে সেটাও খতিয়ে দেখা হবে। আমি একটি নিরাপদ ইভেন্টের জন্য তাদের সঙ্গে কাজ করতে চাই এবং যদি তাদের মালিকানার মাধ্যমে খারাপ লোকেরা এই ইভেন্টে প্রবেশ করে, তবে তার পরিণতি কী হবে।’

মার্শাল ও তার দল বিসিবির ৯০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন পড়েছেন, জানিয়েছেন তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণও, ‘৯০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি পড়ার ভিত্তিতে আমি গভর্নিং কাউন্সিলকে পরামর্শ দিয়েছি যে, কিছু ব্যক্তিকে যেন এই বিপিএল সংস্করণে আমন্ত্রণ জানানো না হয়। তাদের কেউ খেলোয়াড়, আবার কেউ খেলোয়াড় নন। সমস্যা যাতে না হয়, তা প্রতিরোধের জন্যই আমি এই পরামর্শ দিয়েছি। এই মানুষগুলোকে ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তবে তাদের এই ইভেন্টে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না।’

পরিশেষে মার্শাল একই সঙ্গে সতর্কবার্তা ও আস্থার বাণী শোনালেন বিপিএলের ১২তম আসরকে ঘিরে, ‘বিপিএলকে রক্ষা করতে সাহায্য করার জন্য আমার এখন একটি খুব ভালো দল কাজ করছে, তবে আমরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের কাছ থেকেও সহায়তা এবং বিশেষ তথ্য পাব, যারা সারা বিশ্বে এই ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত। তারা এই ইভেন্টের জন্য আমার বিসিবি ইন্টিগ্রিটি ইউনিটকে সমর্থন করার জন্য অতিরিক্ত বিশেষ তথ্য সরবরাহ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

এর ফলে নিঃসন্দেহে স্বচ্ছতা, আস্থা ফিরবে বিপিএলে, উন্নত হবে ভাবমূর্তি। তবে সর্ষের ভেতরই যদি ভূত থাকে তাহলে সবই যে যাবে বিফলে!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত