আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড দাবি প্রসিকিউশনের

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:০৯ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানিয়েছে প্রসিকিউশন। আজ সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এ সংক্রান্ত আপিল দায়ের করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম।

প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ যে অভিযোগে শেখ হাসিনাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন, সেখানে অপরাধের মাত্রা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সর্বোচ্চ শাস্তিই প্রযোজ্য হওয়া উচিত। এ কারণেই সাজা বৃদ্ধি করে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, এ ধরনের আপিল ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ আশা করছে, অবকাশকালীন ছুটির পর চেম্বার আদালতে বিষয়টি উপস্থাপনের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আপিলের শুনানি ও নিষ্পত্তি হবে।

এর আগে, গত ২৭ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে গাজী এম এইচ তামীম জানিয়েছিলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের অনুলিপি রাষ্ট্রপক্ষ হাতে পেয়েছে। তখনই তিনি জানান, যে অভিযোগে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে আখ্যায়িত করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। পরবর্তীকালে তার বক্তব্য ও নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাসহ একাধিক অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গত ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।

তবে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় সর্বোচ্চ শাস্তির যোগ্য। প্রসিকিউশনের মতে, এ অপরাধে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনো সাজা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না।

মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একই দিনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। একই রায়ে রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলা দায়ের হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। গত বছরের ১৭ অক্টোবর এ মামলার প্রথম বিচারকাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং সেদিনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

পরবর্তীকালে চলতি বছরের ১৬ মার্চ প্রসিকিউশনের আবেদনের পর সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকেও মামলার আসামি করা হয়। একাধিক দফা সময় বাড়ানোর পর ১২ মে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এরপর ১ জুন শেখ হাসিনাসহ ৩ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। অভিযোগে মোট ৫টি ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে উস্কানিমূলক বক্তব্য, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ, রংপুরে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড, চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ায় হত্যার ঘটনা।

এই মামলায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল বর্তমানে পলাতক। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি হিসেবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেন এবং একপর্যায়ে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন। যুক্তিতর্ক শেষে গত ২৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল এ মামলার রায় ঘোষণা করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত