স্বাধীনতার ৫৫ বছর উদযাপন করছে বাংলাদেশ। এবারের বিজয় দিবসে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ভিন্ন ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে যা অতিতে এতটা প্রবলভাবে দেখা যায়নি। সময়টা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিট। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (রেসকোর্স ময়দান) আত্মসমর্পণের দলিলে সই করে।
পাকিস্তান বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করলেও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ সে খবর জেনেছিল আরও পরে রেডিওর মাধ্যমে। যদিও বেশ কিছু মানুষ রেসকোর্স ময়দানে ওই অনুষ্ঠান দেখারও সুযোগ পেয়েছিল।
ওই দিন বেলা ১২টার দিকেই যারা ভারতীয় বাহিনীকে ঢাকায় প্রবেশ করতে দেখছিল তারা অবশ্য রাস্তায় নেমে এসেছিল। পাশাপাশি ঢাকায় আগে থেকেই আত্মগোপনে থাকা মুক্তিবাহিনীর সদস্যরাও বাইরে বের হয়ে আসে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তার 'বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি ১৯৭১-২০১১' বইয়ে ১৬ ডিসেম্বরের তথ্য দিয়ে লিখেছেন যে, ওই দিন সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে মিত্রবাহিনী ঢাকায় প্রবেশ করে।
তিনি লিখেছেন, ‘ওদিকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ প্রান্তে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের প্রবেশ। ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে বিকাল ৫টায় ভারত ও বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাদের শর্তহীন আত্মসমর্পণ। মেজর জেনারেল জ্যাকবের প্রস্তুত করা আত্মসমর্পণ দলিলে লে. জে নিয়াজী ও লে. জে অরোরা স্বাক্ষর করেন।’
১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর বিবিসিতে প্রচারিত অ্যালান হার্টের একটি তথ্যচিত্রে দেখা যায়, মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা বেরিয়ে আসছে আর লোকজন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবের নামে কিংবা জয় বাংলা স্লোগান দিচ্ছিল।
রিপোর্টের ফুটেজে দেখা যায়, বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করছে মানুষ। যদিও তখনো কোথাও কোথাও গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিলো এবং এরই এক পর্যায়ে ভারতীয় বাহিনী শহরে প্রবেশ করলে লোকজন তাদের নিয়েও উল্লাস করতে থাকে।
১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভারতীয় নৌবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক ভাইস অ্যাডমিরাল এন কৃষ্ণানের স্মৃতিচারণামূলক বই ‘নো ওয়ে বাট সারেন্ডার’-এ তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করার সময় পাকিস্তানি সেনা অধিনায়ক এ এ কে নিয়াজি প্রথমবার তার পুরো নামটি লেখেননি। নিজের নাম তিনি লিখেছিলেন ‘নিয়া’। তাঁকে দিয়ে আবার পুরো নামটি লেখানো হয়েছিল।’
আত্মসমর্পণের দলিলের প্রতিটি শর্তই বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনী ঠিক করেছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী এসব শর্তের বেশ কিছু বিষয়ে আপত্তি করলেও তা মানা হয়নি।
পাকিস্তান চেয়েছিল আত্মসম্পর্ণের অনুষ্ঠান গোপনে আয়োজন করতে। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব জানিয়ে দেন, অনুষ্ঠান হবে প্রকাশ্যে।
জ্যাকব জানান, আত্মসম্পর্ণের দলিলটি যেন অসম্মানজনক না হয়, সেদিনে নজর রাখা হয়েছিল।
এতে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর পক্ষে সই করেন কমান্ডার-ইন-চিফ লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, আর যুদ্ধরত পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ছিলেন তখনকার বিমান বাহিনীর প্রধান ও মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান এয়ার কমোডর এ কে খন্দকার।
সেদিন কী হচ্ছিল ক্যান্টনমেন্টে
সেদিন আত্মসমর্পণ নিয়ে সকাল থেকেই ক্যান্টনমেন্টে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল গন্দর্ভ সিং নাগরা ও পাকিস্তানের মেজর জেনারেল জামশেদসহ দুপক্ষের মধ্যে।
একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কমান্ডে যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত পাকিস্তানিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে। এর আগেই অনেক জায়গায় তাদের পতন হয়ে গিয়েছিলো।
৮ ডিসেম্বর ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ প্রথমবারের মতো পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব।
তিনি তার ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’ বইতে লিখেছেন, ‘১৬ ডিসেম্বর সকাল সোয়া নয়টায় জেনারেল মানেকশ ফোনে আমাকে অবিলম্বে ঢাকায় গিয়ে সেই দিনই সন্ধ্যার মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে বলেন।’
জ্যাকবের বই ছাড়াও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের লেখা ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ এবং তখনকার পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী খানের ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’ বইতেও ওই দিন ক্যান্টনমেন্টে যা যা ঘটেছে এবং এরপর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
বিভিন্ন বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন সকালে ঢাকায় থাকা পাকিস্তানি সেনাকর্মকর্তারা তাদের দপ্তরে যখন বৈঠক করছিলেন তখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল গন্দর্ভ সিং নাগরার একটি লিখিত বার্তা এসে পৌঁছায় সেখানে।
ওই বার্তায় লেখা ছিল, ‘প্রিয় আবদুল্লাহ, আমি এখন মিরপুর ব্রিজে। আপনার প্রতিনিধি পাঠান।’ এর আগে সকাল আটটা নাগাদ ঢাকার মিরপুর ব্রিজের কাছে মেজর জেনারেল নাগরাকে বহনকারী একটি সামরিক জিপ এসে থামে।
এরপর জেনারেল নাগরাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য মেজর জেনারেল জামশেদকে পাঠানো হলো এবং মিরপুর ব্রিজের কাছে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যদের জেনারেল নাগরাকে নিরাপদে শহরে ঢুকতে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হলো।
বিষয়টির বর্ণনা দিয়ে সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, ‘ভারতীয় জেনারেল হাতে গোনা সৈন্য এবং অনেক গর্ব নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করলেন। তখনই কার্যত ঢাকার পতন হয়ে গেলো।’
জেনারেল নাগরা কমান্ড অফিসে পৌঁছানোর পর জেনারেল নিয়াজী তার সাথে কৌতুকে মেতে উঠেন। সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, সেসব কৌতুক এতটাই নোংরা ও ভাষার অযোগ্য ছিল যে সেগুলো বইয়ে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
সে মুহূর্তের বর্ণনা জেনারেল রাও ফরমান আলী খান তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘জেনারেল নিয়াজি তার চেয়ারে বসে আছেন, তার সামনে জেনারেল নাগরা রয়েছেন এবং একজন জেনারেলের পোশাকে রয়েছেন মুক্তিবাহিনীর টাইগার সিদ্দিকীও (কাদের সিদ্দিকী)। শুনলাম নিয়াজি নাগরাকে জিজ্ঞেস করছেন তিনি উর্দু কবিতা বোঝেন কি না।’
ইতোমধ্যে ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের জেনারেল জে আর জ্যাকব ঢাকায় অবতরণ করেছেন। তিনি সাথে এনেছেন আত্মসমর্পণের দলিল, যা তিনি পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেন। কিন্তু নিয়াজী একে বর্ণনা করছিলেন ‘যুদ্ধ বিরতির খসড়া প্রস্তাব’ হিসেবে।
আত্মসমর্পণ দলিলে ‘ভারতীয় যৌথ কমান্ড এবং বাংলাদেশ বাহিনীর’ কাছে আত্মসমর্পণ করছে পাকিস্তান বাহিনী- এমন বাক্য থাকায় রাও ফরমান আলী আপত্তি জানান।
এসময় জেনারেল জ্যাকবের সঙ্গে থাকা ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্নেল খেরা শুধু বলেন, ‘এটা বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আপনারা শুধু ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করছেন।’
জে আর এফ জ্যাকবের লেখা বইতেও এ বিষয়ে এভাবে উঠে এসেছে, ‘আমি নিয়াজীর অফিসে ফিরে এলে কর্নেল খেরা আত্মসমর্পণের শর্তাবলী পাঠ করে শোনান। নিয়াজির চোখ থেকে দরদর করে পানি পড়তে থাকে, সেই সাথে ঘরে নেমে আসে পিনপতন নিস্তব্ধতা। রাও ফরমান আলী ভারতীয় ও বাংলাদেশি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানান। নিয়াজি বলেন যে, আমি তাকে যেটাতে সই করতে বলছি সেটাই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিল।’
দুপুরের পর জেনারেল নিয়াজী ঢাকা বিমানবন্দরে গেলেন ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার জগজিৎ সিং অরোরাকে অভ্যর্থনা জানাতে। অরোরা স্ত্রীকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। ততক্ষণে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল। আর ১২টার পর থেকেই ভারতীয় বাহিনী ধীরে ধীরে শহরে প্রবেশ করতে শুরু করে।
রাও ফরমান আলীসহ আরও একজন কর্মকর্তা নিয়াজীকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে যোগ না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তিনি তা শুনতে রাজি হননি। জেনারেল অরোরা এবং জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষরের পর নিয়াজী তার রিভলবারটি অরোরার হাতে তুলে দেন।
জ্যাকব ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’ বইতে লিখেছেন, ‘সময় তখন বিকাল ৪টা ৫৫মিনিট। এরপর নিয়াজী তার কাঁধ থেকে এপ্যলেট (সেনা অধিনায়কদের সম্মানসূচক ব্যাজ) খুলে ফেলেন এবং ল্যানিয়ার্ড (একটি ছোট দড়িবিশেষ) সহ পয়েন্ট ৩৮ রিভলবার অরোরার হাতে ন্যস্ত করেন। তার চোখে অশ্রু দেখা যাচ্ছিলো। সন্ধ্যা হয়ে আসছিলো। রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত জনতা তখন নিয়াজী বিরোধী ও পাকিস্তানবিরোধী স্লোগান ও গালিগালাজ করতে থাকে।’
পরে জেনারেল নিয়াজী ও ঊর্ধ্বতন কমান্ডারদের ২০ ডিসেম্বর কলকাতায় নিয়ে ফোর্ট উইলিয়ামে থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
কি লেখা ছিল আত্মসমর্পণের দলিলে
সেদিন স্বাক্ষর করা আত্মসমর্পণের দলিলে লেখা ছিল, পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশি যৌথ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে, পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সব সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণে সম্মত হলো।
পাকিস্তানের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ সব আধা-সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে এই আত্মসমর্পণ প্রযোজ্য হবে। এই বাহিনীগুলো যে যেখানে আছে, সেখান থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সবচেয়ে নিকটস্থ সেনাদের কাছে অস্ত্রসমর্পণ ও আত্মসমর্পণ করবে।
এই দলিল স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার নির্দেশের অধীন হবে। নির্দেশ না মানলে, তা আত্মসমর্পণের শর্তের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে এবং তার প্রেক্ষিতে যুদ্ধের স্বীকৃত আইন ও রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আত্মসমর্পণের শর্তাবলীর অর্থ অথবা ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো সংশয় দেখা দিলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণকারী সেনাদের জেনেভা কনভেনশনের বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করছেন এবং আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সামরিক ও আধা-সামরিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুবিধার অঙ্গীকার করছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীন বাহিনীগুলোর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও জন্মসূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের সুরক্ষাও দেওয়া হবে।
লেখক: সহ-সম্পাদক, দেশ রূপান্তর অনলাইন