খুলনায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম উপকূলীয় শিশু সম্মেলনে শিশু প্রতিনিধি নওশীন ইসলাম ও নুর আহমেদ জিদান বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলও- উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য সেবার জন্য কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেই। কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নেই, কোনও স্কুলে প্রশিক্ষিত কাউন্সিলর নেই। শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে শিশুরা নিজের কষ্ট নিজের মধ্যেই চেপে রাখে, যা ভবিষ্যতে তাদের আচরণ, আত্মবিশ্বাস, সামাজিকতা ও শিক্ষাজীবনে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) সকালে উপকূলীয় শিশু ফোরামের আয়োজনে নগরীর সিএসএস আভা সেন্টারে অনুষ্ঠিত সম্মেলন তারা এ কথা বলেন।
শিশু ফোরামের প্রতিনিধিরা বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের শব্দ শুধু বাতাসের শব্দ নয়- এটি একটি শিশুর বুকে জমে থাকা ভয় ও আর্তনাদ। জলোচ্ছ্বাসের পানি কেবল পানি নয়, এটি একটি শিশুর স্বপ্ন, বাড়ি ও স্কুল ভাসিয়ে নেওয়ার নিষ্ঠুর বাস্তবতা। দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক আঘাত শিশুদের মনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত সৃষ্টি করে, যা অনেক সময় দৃশ্যমান না হলেও অত্যন্ত গভীর। তারা রাতে ঘুমাতে পারে না, উচ্চ শব্দে ভয় পায়, একা থাকতে চায় না এবং মনোযোগ হারায়- যা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি)-এর লক্ষণ।
শিশু প্রতিনিধিরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা- তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও শৈশব বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নীতি-নির্ধারণে শিশুদের অংশগ্রহণ প্রায় অনুপস্থিত। আশ্রয়কেন্দ্রের নকশা, পানি ও স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য সেবা কিংবা স্কুল পুনর্গঠনের পরিকল্পনায় শিশুদের বাস্তব চাহিদা উপেক্ষিত থাকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি কিংবা উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় শিশুদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ‘শিশুদের সঙ্গে থাকুন, শিশুদের অধিকারের কথা বলুন এবং শিশুদের দাবিকে অগ্রাধিকার দিন- আজ, আগামীকাল ও সর্বদা’। জলবায়ু সহনশীল ও নিরাপদ শিশু বান্ধব উপকূলীয় গঠনে রাষ্ট্র, সমাজ ও সকল অংশী জনের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য বলে মত দেন তারা সম্মেলনে বক্তারা বলেন,উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুদের জীবনযাত্রা জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ঝুঁকির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের, বন্যা, নদী ভাঙন এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব-এসব চ্যালেঞ্জ শিশুদের প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতা আমাদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করে, যাতে উপকূলীয় শিশুদের সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা যায়।
বক্তারা মনে করেন, শিশুদের মতামত যদি জাতীয় ও স্থানীয় পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়, তবে সেই পরিকল্পনা আরও ন্যায্য, টেকসই ও কার্যকর হবে।
বক্তারা আরও বলেন, জলোচ্ছ্বাসের ও ঘূর্ণিঝড় শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে না- এগুলো শিশুদের শৈশব, আনন্দ, খেলা ও সামাজিক পরিবেশও কেড়ে নেয়। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুরা শারীরিক সক্রিয়তা, সৃজনশীলতা ও মানসিক শক্তি বিকাশের মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এক অর্থে দুর্যোগ উপকূলীয় শিশুদের রঙিন শৈশবকে ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বক্তারা বলেন, নীতি-নির্ধারণে শিশুদের কণ্ঠ হীনতা হলও সবচেয়ে বড় জলবায়ু অন্যায়।
জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে শিশুদের অংশগ্রহণকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর জোর দেন বক্তারা। তারা বলেন, শিশুরা কেবল দুর্যোগের ভুক্তভোগী হতে চায় না- তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ হতে চায়।
জাগ্রত যুব সংঘ-জেজেএস-এর নির্বাহী পরিচালক এটিএম জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক, গবেষক ও শিক্ষা পরামর্শক ড. রেজা মাহমুদ আল হুদা এবং নগর পরিকল্পনাবিদ আবেদ ফেরদৌস হোসেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খুলনা প্রেসক্লাবের আহবায়ক এনামুল হক, জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুরাইয়া সিদ্দিকা, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইদুর রহমান এবং খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রতি রেজবিনা খাতুন রিক্তা।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সিনিয়র ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম) এমএম চিশতি। সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন শিশু প্রতিনিধি সাহারা রহমান ও স্নেহী।
দিনব্যাপী এ উপকূলীয় শিশু সম্মেলনের সমাপনই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম। সম্মেলনে উপকূলীয় শিশুরা ১৭ দফা দাবিনামা তুলে ধরেন।
