ভোলার তজুমদ্দিন

বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ বন্ধ, ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দুই শতাধিক পরিবার

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:০৫ পিএম

ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নে অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণের ফলে ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দালাল কান্দি এলাকার প্রায় দুই শতাধিক বাসিন্দা ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। এলাকার বাসিন্দারা বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।

এ নিয়ে গত শুক্রবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার। বাঁধের পাশের বাসিন্দাদের পুনর্বাসন ছাড়া নির্মাণাধীন বাঁধের কাজ করতে দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। চাঁদপুর ইউনিয়নের দালালকান্দি বেড়িবাঁধে শত শত নারী পুরুষ এ মানববন্ধন করেন। এর আগে তারা বিক্ষোভ মিছিল করেন।

তাদের দাবি, চাঁদপুর ইউনিয়নের দালালকান্দি, হাজিকান্দি ও ভুইয়া কান্দি এ তিন গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে হবে। দরিদ্র জেলে পরিবারগুলোর পক্ষে অন্যত্র গিয়ে নতুন করে ঘরবাড়ি করার সামর্থ নাই। তাদের জমির ওপর দিয়ে বেড়িবাধ নিলেও সরকারিভাবে কোনও ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। তাই ক্ষতিপূরণ ছাড়া তারা বাঁধ করতে দেবে না।

এলাকার বৃদ্ধ নুরুল হক জানান, একাধিকবার নদী ভাঙনের কারণে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের জমিতে পলিথিন দিয়ে ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করেছি। স্থানীয় এক ব্যক্তি দয়া করে একটি ঘর করে দিয়েছেন। এখন নতুন করে বেড়িবাঁধ করার জন্য ঘর সরাতে বলেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন। না সরালে তার নাকি ঘর ভেঙে দেবেন। কিন্তু ঘর নিয়ে কোথায় রাখবেন সেই যায়গাও খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। তার যাওয়ার কোনও যায়গা নেই। তাই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এ বৃদ্ধ।

গত শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) সকালে সরজমিনে তজুমদ্দিনের দালাল কান্দি এলাকায় গেলে এ দুশ্চিন্তার কথা বলেন বৃদ্ধ নুরুল হক। একই দুশ্চিন্তার কথা জানালেন এলাকার ৭০ বছর বয়সী বিবি মরিয়ম।

মরিয়ম বলেন, চার বার নদী ভাঙনের কবলে পড়ে চার শতাংশ যায়গা কিনে দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ তিনটি ছোট ছোট ঘর করে বসবাস করে আসছেন। এর আগে ২০১৮ সালে বেড়িবাঁধ করায় একবার ঘর ভাঙা পড়েছে। এখন আবার নতুন করে বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হওয়ায় গত কয়েক দিন আগে লোকজন এসে তাদের ঘর সরিয়ে নিতে বলছেন। এখন কোথায় যাবেন সেটি জানেন না। একই কথা বলেন সেখানকার বাসিন্দা বিবি আফরোজা (৭৫), মো. হারুন, মিনারা ও মো. স্বপন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, নিষ্কাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তজুমদ্দিন উপজেলায় ৭৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের কাজ চলমান রয়েছে। গত ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মেসার্স গোলাম রাব্বানী কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। আগামী ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কজের মধ্যে রয়েছে একটি তিন কপাট স্লুইসগেট, একটি দুই কপাট স্লুইসগেট, ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার মাটির কাজ, নদীর পাশে ব্লকের প্রটেকশন ও নদী থেকে বাঁধ পর্যন্ত দুটি নালা নির্মাণ। ইতোমধ্যে স্লুইসগেট দুইটির কাজ চলমান রয়েছে এবং দেড় হাাজর মিটার বাঁধের কাজ চলমান রয়েছে। তবে দালাল কান্দি আড়াই কিলোমিটার বাঁধের কজা করতে গিয়ে স্থানীয়দের বাঁধার সম্মুখীন হয়ে কাজ বন্ধ রয়েছে। এ পর্যন্ত মোট কাজের ৩০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

কাজের দায়িত্বে থাকা ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. তানভীর হোসেন রাসেল বলেন, বর্তমানে তজুমদ্দিন-লালমোহন উপজেলার উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন (১ম পর্যায়ে) প্রকল্পের আওতায় কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে দেড় কিলোমিটার বাঁধের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে উপজেলা শহরের কাছাকাছি হওয়ায় কাজ করতে এসে স্থানীয়ের বাঁধার মুখে পড়তে হয়েছে। তাদের বাড়িঘর পড়ায় তারা কাজ করতে দিবে না। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে তারা সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে তজুমদ্দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে বসা হয়েছে। সেখানে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে আমাদের পক্ষ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা তা মানেনি। এখন স্থানীয়দের দাবি ক্ষতিপূরণ দেওয়া। কিন্তু এ প্রকল্প পাশ হওয়ার সময়ই বলে দেওয়া হয়েছে স্থানীয় স্বেচ্ছায় জমি দিবেন। এখন এর বাইরে আমাদের কিছুই করার নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, তারা দেখবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত