পৃথিবী আজ ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন অস্তিত্বের প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে অনেক যুদ্ধ হয়েছে, অনেক মহামারী এসেছে, অনেক সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের মতো এমন সর্বগ্রাসী সংকট কখনো আসেনি। এটি এখন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা অনেক বছর ধরেই সতর্ক করে আসছেন, আমরা সেই সতর্কবার্তায় খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। তার ফল এখন ভোগ করতে শুরু করেছি। প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। আগামী দিনগুলোতে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনই বিশ্বের পরবর্তী মহাসংকট। জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশের ক্ষতি করছে না বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। কৃষি খাত এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে পড়বে। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে। ফলে বিশ্ব জুড়ে খাদ্যের দাম বাড়বে। দরিদ্র দেশগুলোর মানুষ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়বে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী কয়েক দশকে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। বড় বড় শহরগুলো বন্যার কবলে পড়লে অবকাঠামোর বিশাল ক্ষতি হবে। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়তে পারে। বীমা কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। সবমিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এক বিশাল মন্দার কবলে পড়তে পারে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। হিটস্ট্রোক এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর বাইরেও আছে নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব। মশা ও কীটপতঙ্গবাহিত রোগগুলো নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো রোগগুলো এখন এমন সব দেশে দেখা যাচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার ফলে হাজার বছর ধরে সুপ্ত থাকা অনেক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া জেগে উঠতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন এর ফলে বিশ্বে নতুন কোনো মহামারী দেখা দিতে পারে। আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত নয়। বায়ুদূষণ ইতিমধ্যেই লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এই পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। লোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় চাষযোগ্য জমি নষ্ট হচ্ছে। সুপেয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। এসব কারণে মানুষ তাদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। এদের বলা হচ্ছে জলবায়ু শরণার্থী। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ২১ কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ কোথায় যাবে তা এক বিরাট প্রশ্ন। এক দেশ থেকে অন্য দেশে মানুষের ঢল নামবে। এর ফলে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়বে। সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবে। ধনী দেশগুলো নিজেদের সীমানা বন্ধ করে দিতে চাইবে। এতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে। ইতিমধ্যেই আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশ থেকে মানুষ ইউরোপ বা আমেরিকার দিকে পাড়ি জমাচ্ছে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে এবং তা বিশ্বরাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে।
পৃথিবী কেবল মানুষের একার নয়। এখানে লাখ লাখ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ বাস করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই প্রাণিকুল আজ হুমকির মুখে। অনেক প্রজাতি ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরও অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার কারণে প্রবাল প্রাচীরগুলো মরে যাচ্ছে। এগুলো ধ্বংস হলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়বে। এর প্রভাব পড়বে মানুষের ওপর। কারণ আমরা খাদ্যের জন্য সমুদ্রের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ার কারণে বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসছে। এতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত বাড়ছে। বাস্তুতন্ত্রের এই ভারসাম্য নষ্ট হলে, পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। মৌমাছির মতো ছোট পতঙ্গ যদি হারিয়ে যায়, তবে পরাগায়ন বন্ধ হয়ে যাবে। এতে ফল ও ফসলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো চেইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ প্রথম সারিতে। যদিও এই পরিবর্তনের জন্য আমাদের দায় খুব সামান্য। আমাদের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ নগণ্য। অথচ আমরাই এর বড় শিকার। দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে লোনা পানি ঢুকে পড়ছে। এতে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। মানুষ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। ঢাকা শহরের ওপর চাপ বাড়ছে। উত্তরের জেলাগুলোতে খরা ও বন্যা দুটোই বাড়ছে। নদীভাঙনে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ ও তীব্রতা বেড়েছে। সিডর বা আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো আমাদের অর্থনীতিকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও সাহায্য খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের নিজেদের লড়াইটা নিজেদেরই করতে হচ্ছে। কিন্তু এই লড়াই কতদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব তা নিয়ে সংশয় আছে।
মুনাফার লোভে ব্যবসায়ীরা পরিবেশের তোয়াক্কা করছে না। রাজনীতিবিদরা ভোটব্যাংক ঠিক রাখতে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাচ্ছেন। এই ব্যর্থতা আমাদের সবাইকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই যদি তারা সতর্ক না হন, তবে আর কিছুই করার থাকবে না। কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। ব্যক্তি হিসেবে আমারও অনেক দায়বদ্ধতা আছে। আমাদের ভোগবাদী মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। অপচয় রোধ করতে হবে। বিদ্যুৎ বা পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হতে হবে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। মাংস উৎপাদনের জন্য প্রচুর পানি ও জমির প্রয়োজন হয় এবং এতে প্রচুর মিথেন গ্যাস নির্গত হয়। তাই উদ্ভিজ্জ খাবারের দিকে ঝুঁকলে, পরিবেশের উপকার হবে। আমরা যদি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট পরিবর্তন আনি, তবে তা বড় প্রভাব ফেলতে পারে। গণপরিবহন ব্যবহার করা বা সাইকেল চালানো পরিবেশের জন্য ভালো। আমাদের সচেতনতাই পারে বিশ্বকে রক্ষা করতে।
লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
