জুলাই সনদের আলোকে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সদস্যরা। তারা বলেন, রাষ্ট্রসংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয় ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
টিআইবির সদস্যরা একই সঙ্গে জুলাই সনদের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার কতটুকু প্রতিফলিত হবে এবং গণভোট বিষয়ে তাদের অবস্থান নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার আহ্বান জানান। বার্ষিক সভা শেষে প্রকাশিত এক ঘোষণাপত্রে তারা এ দাবি উত্থাপন করেন।
ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচিত হলেও জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়নি—এমন সুপারিশসমূহ এবং আলোচনার বাইরে থাকা সংস্কার কমিশনগুলো, বিশেষ করে গণমাধ্যম, নারী, শ্রম, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকারবিষয়ক কমিশনের সুপারিশ যেন বিস্মৃত না হয়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঞ্চালনায় সংস্থাটির ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সভায় বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার সদস্যরা সশরীরে ও অনলাইনে অংশ নেন। সভায় টিআইবির গবেষণা, অধিপরামর্শমূলক ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম এবং আর্থিক হিসাবসংক্রান্ত সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন নিরীক্ষা প্রতিবেদন সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেন সদস্যরা।
টিআইবির সদস্যদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হলো কর্তৃত্ববাদের অবসানের মধ্য দিয়ে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য স্বাধীন ও নির্ভীক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সকল রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণা যেন অর্থ ও পেশিশক্তির প্রদর্শনে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর উসকানিমূলক আচরণ ও রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহারের ক্রমবর্ধমান প্রবণতায় উদ্বেগ জানিয়ে টিআইবি সদস্যরা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। পাশাপাশি, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা অটুট রেখে একটি অসাম্প্রদায়িক ও সুশাসিত বাংলাদেশ গঠনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী-পুরুষসহ সকল জেন্ডার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সম-অধিকার নিশ্চিতের আহ্বান জানান তারা।
দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, নিউ এইজ সম্পাদক নূরুল কবিরের ওপর হামলা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটে হামলার ঘটনাকে টিআইবির সদস্যরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানান। এসব ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।
ঘোষণাপত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের সুপারিশ উপেক্ষা করার বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। টিআইবি সদস্যদের মতে, এটি রাষ্ট্রসংস্কারের অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একইভাবে পুলিশ কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে কমিশনগুলোকে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়।
নারীর অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন না হওয়া এবং নারী হয়রানি ও সহিংসতা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে টিআইবি সদস্যরা বলেন, উগ্র ও নারীবিদ্বেষী গোষ্ঠীর তৎপরতায় নারীদের চলাচল ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূর করতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
এ ছাড়া তথ্য কমিশন কার্যকর করা, পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার, অর্থ পাচার রোধ, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতিতে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয় ঘোষণাপত্রে।
সভা শেষে মহান ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে গণতন্ত্র, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে সকল পক্ষকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
