কেরানীগঞ্জে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অর্থ লোপাটের অভিযোগ

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম

দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমান উন্নয়নে টিআর, কাবিখা প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার প্রতি বছর  সারা দেশে বরাদ্দ দিয়ে থাকে। তবে ঢাকার কেরানীগঞ্জে টিআর, কাবিখা কর্মসূচীর আওতায় বরাদ্দের একটা অংশ  চলে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজ কিছু ব্যাক্তির পকেটে। নির্ধারিত কাজ না করেই লোপাট করা হচ্ছে প্রকল্পের অর্থ। পাকা রাস্তায় মাটি ভরাট, খেলার মাঠে মাটি ভরাটসহ নানা প্রকল্প দেখিয়া লোপাট করা হচ্ছে প্রকল্পের অর্থ। প্রকল্পের নামে এসব অনিয়মে হতাশা প্রকাশ করেছে স্থানীয়রা।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস থেকে দেওয়া তথ্য মতে, ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে আগানগরের ৪ নং ওয়ার্ড নামাপাড়ায় টুইন টাওয়ার হোটেল থেকে আলমগীরের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তায় মাটি ভরাটের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটিতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ৪ লাখ টাকা। তবে নামাপাড়ার  ঐ রাস্তাটি ৩ বছর আগেই সিসি ঢালাই করে পাকা করে হয়েছিলো বলে স্থানীয়রা জানান। আর রাস্তাটিতে মাটি ফেলা হয়েছে প্রায় ২ যুগ আগে। 

এদিকে ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে মাটি ভরাট প্রকল্পটির কাজ পাওয়া ঠিকাদার মো. ইমরান শেখের সাথে এ বিষয়ে কথা হলে  তিনি জানান, এটা মাটি ভরাটের প্রজেক্ট না, রাস্তার কিছু কিছু জায়গায়  সংষ্কার করার জন্য তিন লাখ টাকা দেয়া হয়েছিল। দেশ রূপান্তরের হাতে বরাদ্দের কাগজ পত্র আছে জানালে তিনি বলেন, বরাদ্দ চার লাখ টাকা ছিলো, তবে তিনি সেটা পান নি। বরাদ্দের পুরো টাকা পাওয়া যায় না, কিছু খরচ করতে হয় বলে জানান তিনি। ইমরান শেখ আরো জানান, তিনি পুরো টাকাই রাস্তার সংষ্কার কাজে ব্যয় করেছেন।

সরেজমিনে নামাপাড়ার টুইনটাওয়ার থেকে আলমগীরের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তায় গিয়ে দেখা যায়, মাটি ভরাট অথবা ৪ লাখ টাকার সংষ্কার হয়েছে, এমনটা মনে হয় না। সামান্য কিছু সংষ্কার হলেও সেটা উল্লেখযোগ্য মনে হলো না। স্থানীয়দের কাছ থেকেও জানা যায়, গত কয়েক বছরে সংষ্কার না হওয়ার তথ্যটি। 

মো. জসিম নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, তিন বছরের মধ্যে এই রাস্তায় কোনো কাজ হয় নি। রাস্তাটি সিসি ঢালাই করা হয়েছে ২০২২ সালে। তিনি আরও বলেন, এলাকার ভিতরের রাস্তা হওয়ায় বড় গাড়ি চলে না তেমন, তাই রাস্তাটা এখনো ভালো রয়েছে। 

স্থানীয় দোকানী ওয়াদুদ মিয়া জানান, গত ২/১ বছরে কাজ হয়েছে এমনটা আমরা দেখি নাই। আমি এখানে ১০ বছর ধরে দোকান করি। কাজ হলে তো চোখে পড়তোই। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা সোহেল জানান, ২০ বছর আগে এই রাস্তায় মাটি ফেলা হয়েছে। আর সর্বশেষ ২০২২ সালে রাস্তাটি সিসি ঢালাই করা হয়েছিলো। এর পরে আর কেউ কাজ করে নি। 

এদিকে কেরানীগঞ্জের কালিন্দী খেলার মাঠটিও সংষ্কার করা হয় নি গত এক যুগেও। তবে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে কাবিখা কর্মসূচির আওতায় কালিন্দী ইউনিয়নে মাঠ সংস্কার বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিলো ৫.৯৯৩ মেট্রিক টন গমের পরিমান নগদ অর্থ, যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় পৌনে দুইলাখ টাকা। বরাদ্দের টাকা পাশ হলেও, মাঠটিতে হয় নি কাঙ্খিত কোন সংস্কার। মাঠের প্রবেশ পথে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে মাটি ভরাট প্রকল্পের একটি স্মৃতিফলক থাকলেও মাঠটিতে নিয়মিত যারা খেলাধূলা করে, তারা বলছেন গত কয়েক বছরেও সংষ্কার হয় নি এখানে।

নিয়মিত মাঠে খেলতে আসা মো. রনি বলেন, আমি ছোট বেলা থেকেই এই মাঠে নিয়মিত খেলাধূলা করি। মাঠটি কেরানীগঞ্জের একটি ঐতিহ্যবাহী মাঠ হলেও অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কয়েকবার মাঠটি রক্ষায় প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা থাকলেও কোন কাজ  হয় নি। আমরা চাই মাঠটিকে সংষ্কার করে রক্ষনাবেক্ষণ করা হোক।

মো. সামিউল নামে অপর একজন বলেন, কয়েকবছর ধরে সংস্কার হবে হবে শুনলেও কোন কাজ হয় নি মাঠটিতে। শুধু গত বছর ফেব্রুয়ারী মাসে একটা টুর্নামেন্ট চলাকালীন মাটি এনে মাঠের কয়েকটা গর্ত নাম মাত্র ভরাট হয়েছে। এই সামান্য কাজ ছাড়া আর কোন কাজই হয় নি গত কয়েক বছরে।

প্রকল্পের নামে এমন অনিয়ম ও লুটে হতাশা প্রকাশ করেছে কেরানীগঞ্জের সাধারণ জনগন। মো. আলম নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পরেও যদি এমন লুটপাট হয় তাহলে আর পরিবর্তন হলো কোথায় ? আসলে সব কিছু আগের মতোই আছে শুধু আগে যারা লুটপাট করতো এখন তাদের দায়িত্ব অন্যরা কাধে নিয়েছে। 

প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়ে কেরানীগঞ্জের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাসেদ খানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, নামাপাড়ার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে কি না সেটা আমার দেখতে হবে, দেখে বলতে পারবো। আর কালিন্দী মাঠে পিচের কাজ হয়েছে, কাজ একেবারে হয় নি তা না। কিছুটা কাজ হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে কথা বলুন।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার উমর ফারুক বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি, অনিয়মের বিষয়গুলো আপনার কাছ থেকে শুনলাম, বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। অনিয়ম হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত