শ্রমিকের জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিতসহ ১৫ সুপারিশ নেতাদের

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪২ পিএম

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে শ্রমিকদের জন্য রেশন, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ বাড়ানোসহ ১৫ দফা সুপারিশ রাখার অনুরোধ করেছে শ্রমিক অধিকার জাতীয় অ্যাডভোকিসে অ্যালায়েন্স।

বুধবার (৭ জানুয়ারি) শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও ফেডারেশন নিয়ে গঠিত এই অ্যালায়েন্স বা জোট সংবাদ সম্মেলন করে শ্রমিক ইশতেহার প্রকাশ করেছে। 

রাজধানীর বিজয়নগরের ৭১ হোটেলে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। শ্রমিক ইশতেহার তুলে ধরেন অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব ও বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সুপারিশ আকারে তুলে ধরতে জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, শ্রমিক অধিকার সংগঠন ও তাদের বিভিন্ন জোট, শ্রমিক অধিকার ও কল্যাণ ইস্যুতে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে শ্রমিক অধিকার জাতীয় অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্স গঠিত হয়।

ইশতেহারে যা আছে তা হচ্ছে— অ্যালায়েন্সের পক্ষ থেকে শ্রমিক ইশতেহারে প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, কৃষি, গৃহকর্মী, অভিবাসী, আউটসোর্সিং, আত্মনিয়োজিত, সেবা খাতসহ সব শ্রমিকের আইনি স্বীকৃতি, নিবন্ধন ও সুরক্ষা নিশ্চিতের সুপারিশ করেছে। 

এ ছাড়া শ্রমজীবী মানুষের শোভন ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা এবং জীবনধারণের উপযোগী মজুরি (লিভিং ওয়েজ) ভিত্তি ধরে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি মজুরিবৈষম্য দূর করার সুপারিশও করা করেছে।

শ্রমিকের জন্য রেশন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবাসহ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে অ্যালায়েন্স। ইশতেহারে বলা হয়েছে, গ্রাম ও শহরের শ্রমজীবী মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে রেশন ও পর্যায়ক্রমে সবার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। রেশনিং ব্যবস্থা চালু না হওয়া পর্যন্ত বড় বড় সব শহর, কারখানা ও শিল্পঘন এলাকায় টিসিবির মাধ্যমে স্থায়ী ন্যায্যমূল্যের দোকান এবং ওএমএসের মাধ্যমে শ্রমিকদের পণ্য দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শ্রমিক স্বাস্থ্য কার্ড চালু করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার পর শ্রমিকদের জন্য চিকিৎসা সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি ভাতা দিতে হবে।

ইশতেহারে নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন মাতৃত্বকালীন ছুটি ছিল ১১২ দিন। গত মাসে শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে সেটি বাড়িয়ে ১২০ দিন করা হয়েছে।

এ ছাড়া ইশতেহারে শিশু-কিশোর শ্রম বন্ধে সরকারের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকার (ইপিজেড) শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার এবং সব বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শ্রমিকের অধিকার ও দক্ষতা উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়ে জোর দিয়েছে অ্যালায়েন্স।

ইশতেহারে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করেছে অ্যালায়েন্স। এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে শ্রমক্ষেত্রে সংকট মোকাবিলা এবং জবাবদিহিমূলক শ্রম প্রশাসনব্যবস্থা নিশ্চিতে জাতীয় শ্রম কমিশন করার কথাও বলেছে এই জোট।

এ ব্যাপারে অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান বলেন, শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যই এই ইশতেহার। যদিও শ্রমিকদের সব সমস্যার কথা বলা যায়নি। এখানে শুধু প্রধান সমস্যাগুলো সংযুক্ত করা হয়েছে। এই ইশতেহারে শ্রমিকদের যেসব সমস্যা তুলে ধরে সমাধানের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা হলে শ্রমিকদের মর্যাদা, সুরক্ষা ও অধিকার মোটামুটি পূরণ করা যাবে।

নজরুল ইসলাম খান আরও বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে আমরা এই ইশতেহার দিচ্ছি। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এগুলো সংযুক্ত করার অনুরোধ করছি। যদিও অনেক দলের ইশতেহার আমাদের এই ইশতেহারের চেয়ে ছোট। তারপরও আমরা প্রত্যাশা করি, শ্রমিকদের প্রধান সমস্যাগুলো যেন রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে থাকে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সব রাজনৈতিক দলকে অনলাইনে ইতিমধ্যে শ্রমিক ইশতেহার পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত গণফোরাম, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্ট (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই ইশতেহার দেওয়া হয়েছে। দলগুলো ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।

সংগঠনের সদস্যসচিব সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, সব আন্দোলনে শ্রমিক তাঁর রক্ত দেন এবং তাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি থাকে, অথচ পরিবর্তনের হাত ধরে যাঁরা ক্ষমতায় আসেন, তাঁরা শ্রমিকদের কথা মাথায় রাখেন না। তবে শ্রমিকদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের কোনো রূপান্তর হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়কারী আব্দুল কাদের হাওলাদার, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, জাতীয় শ্রমিক জোটের সভাপতি সাইফুজ্জামান বাদশা, বাংলাদেশ ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতি এ আর চৌধুরী রিপন, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার, শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব সেকেন্দার আলী মিনা, নারীপক্ষের সদস্য রওশন আরা প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত