শীত মৌসুমে সাগরের হিমেল ও শান্ত পরিবেশে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালীর উপকূলে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। বঙ্গোপসাগর থেকে প্রতিদিন নানা প্রজাতির মাছ আহরণ করে তা রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরিতে মগ্ন রয়েছেন তারা। এসব শুঁটকি স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হয়ে পাড়ি দিচ্ছে বিদেশের বাজারেও।
বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকা সরলের কাহারঘোনা, পশ্চিম মিনজীরিতলা, শীলকুপের মনকিচর, শেখেরখীল ফাড়িরমুখ, গন্ডামারা, বাহারছড়া, ছনুয়া এলাকাজুড়ে এখন শুঁটকি শুকানোর ধুম। জালিয়াখালী বাজারের পশ্চিমাংশ জলকদর খালের কাহারঘোনা এলাকায় সারি সারি মাছ শুকানোর দৃশ্য যেন এক শুঁটকি মৎস্য নগরীর রূপ নিয়েছে।
এই শুঁটকি পল্লীগুলোতে কয়েকশ শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পুরুষ শ্রমিকরা দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং নারী শ্রমিকরা ৫০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন।
শ্রমিকরা জানান, পর্যাপ্ত রোদ থাকলে মাছ দ্রুত শুকিয়ে যায়, কষ্টও কম হয়। তবে কুয়াশা বা বৃষ্টি হলে শুঁটকি শুকাতে ভোগান্তি বেড়ে যায়। বর্তমানে ফাইস্যা, লইট্যা, ছুরি, পোঁকা প্রজাতির মাছ বেশি শুকানো হচ্ছে। নিয়মিত রোদ পেলে ফাইস্যা মাছ দেড় থেকে দুই দিনে, পোঁকা মাছ তিন দিনে, আর লইট্যা ও ছুরি মাছ পাঁচ দিনে শুকিয়ে যায়। বড় মাছ শুকাতে তুলনামূলকভাবে সময় বেশি লাগে।
বাঁশখালীর হাজারো জেলের একমাত্র জীবিকা সাগরে মাছ আহরণ। কেউ মহাজনের অধীনে মাছ ধরেন, আবার কেউ কাঁচা মাছ কিনে শুঁটকি তৈরি করে বাজারজাত করেন। এখানকার শুঁটকির বিশেষত্ব হলো— কোনো ধরনের ইউরিয়া, লবণ বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করে শুধুমাত্র রোদের তাপে মাছ শুকানো হয়। ফলে বাঁশখালীর শুঁটকি স্বাদে ও গুণে আলাদা, যা ভোক্তাদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
চট্টগ্রামের চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও চকবাজারের আড়তদাররা নিয়মিত বাঁশখালী থেকে লইট্যা, ছুরি, ফাইস্যা, রূপচাঁদা, কোরাল, মাইট্যা, রইস্যা, পোঁহা ও চিংড়ি শুঁটকি কিনে থাকেন। এসব শুঁটকি বর্তমানে দুবাই, কাতার, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ওমান, কুয়েত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
সরলের কাহারঘোনা এলাকার শুঁটকি চাষি ছালে আহমদ জানান, গত তিন মাসে তিনি কয়েক লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি করেছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লাভ হয়েছে। তার শুঁটকি পল্লীতে প্রতিদিন নারী-পুরুষ মিলিয়ে ২০-২৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। তিনি আরও বলেন, সাগরে ৬৫ দিনের মাছ আহরণ নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত শুঁটকি উৎপাদন চলমান থাকে।
তবে জেলেরা জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ শুকানোর ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর উপকূল এলাকায় বিপুল পরিমাণ মাছ নষ্ট হয়। পাশাপাশি সাগরে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় নিরাপদে মাছ আহরণে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জেলে জানান, অতীতে জলদস্যুদের হামলায় বাঁশখালীর একাধিক জেলে আহত হয়েছেন এবং মাছ লুটের শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে ইলিশ মৌসুমে জলদস্যুতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়।
এ বিষয়ে বাঁশখালী সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌসিব উদ্দিন বলেন, ‘বাঁশখালীর শুঁটকি সারাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই পেশাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সরকার মৎস্যজীবীদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিচ্ছে। শুঁটকি পল্লীগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে তাদের সমস্যা ও প্রয়োজন যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
