ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪

মনোনয়ন নিয়ে বিতর্ক: মুশফিকুর রহমানের নাগরিকত্ব ত্যাগ ও আইনি সংকট

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের নাগরিকত্ব ও মনোনয়নের বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক তার ভ্রমণপথে ব্যবহৃত কানাডিয়ান পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া, হলফনামায় দেওয়া তথ্য এবং সরকারি নথির অসামঞ্জস্যতা নিয়ে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র আলোচনা চলছে।

সূত্র জানায়, মুশফিকুর রহমান কানাডিয়ান পাসপোর্ট ব্যবহার করেই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। অথচ তার হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি গত বছরের ২৫ আগস্ট কানাডার নাগরিকত্ব ত্যাগ করে সর্বশেষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেন—যা সরকারি ইমিগ্রেশন নথিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

ইমিগ্রেশন রেকর্ড অনুযায়ী, তার ব্যবহৃত পাসপোর্টটি ছিল কানাডিয়ান পাসপোর্ট। ভ্রমণ ইতিহাসে দেখা যায়, তিনি ২০২৫ সালের ১ জুলাই দুবাই থেকে বাংলাদেশে আসেন, পরে ২৮ জুলাই দেশ ত্যাগ করেন এবং একই বছরের ২৬ আগস্ট প্যারিস থেকে আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এসব তথ্য থেকে সংশ্লিষ্টদের দাবি, মনোনয়ন দাখিলের আগেও তিনি কার্যত কানাডিয়ান নাগরিক হিসেবেই যাতায়াত করেছেন।

তবে তার হলফনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে—‘আমি কানাডার নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছি’। এ দাবির পক্ষে কোনো বৈধ প্রমাণ বা সমর্থনকারী নথি তিনি জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ে জমা দেননি। ফলে তথ্য গোপনের অভিযোগ সামনে এসেছে।

এদিকে কানাডা সরকারের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ প্রক্রিয়া অনুযায়ী, এতে সাধারণত ১১ থেকে ১৬ মাস সময় লাগে। সেই হিসাবে ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের মধ্যে নাগরিকত্ব ত্যাগ সম্পন্ন হওয়া সম্ভব কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কানাডা সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ প্রদান না করলে কাউকে নাগরিকত্ব ত্যাগকারী হিসেবে গণ্য করা যায় না।

নিয়ম অনুযায়ী, নাগরিকত্ব বাতিলের সনদের একটি সত্যায়িত কপি সংশ্লিষ্ট দেশের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মুশফিকুর রহমান কানাডিয়ান নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো নথি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে জমা দেননি।

২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখকে নাগরিকত্ব ত্যাগের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করাকে প্রক্রিয়াগতভাবে অবাস্তব দাবি করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা তথ্য গোপন, মিথ্যা বিবৃতি প্রদান এবং নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, মুশফিকুর রহমান মূলত বয়স্ক ভাতা, বিনামূল্যের চিকিৎসা সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী আবাসন সুবিধা পাওয়ার জন্য কানাডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ বিদেশি নাগরিক হিসেবে সুবিধা ভোগ করলেও নির্বাচনের সময় নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

আইন অনুযায়ী, আরপিওর ১২(১)(গ) ধারায় তথ্য গোপনের ক্ষেত্রে মনোনয়ন বাতিলযোগ্য। সংবিধানের ৬৬(২)(গ) ধারা অনুযায়ী বিদেশি নাগরিকত্বধারী ব্যক্তি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। এছাড়া দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় প্রতারণা, জালিয়াতি ও মিথ্যা দলিল দাখিল অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্ব ত্যাগের সত্যতা গোপন করা এবং এর পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন না করা—উভয়ই মনোনয়ন বাতিলের জন্য যথেষ্ট কারণ।

প্রাপ্ত নথিপত্র, ভ্রমণ ইতিহাস, কানাডিয়ান পাসপোর্ট ব্যবহার, নাগরিকত্ব ত্যাগের অসঙ্গত তারিখ এবং সমর্থক কোনো নথি জমা না দেওয়ার বিষয়গুলো মিলিয়ে মুশফিকুর রহমানের মনোনয়ন বাতিলের সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা।

একই ধরনের অভিযোগে অতীতে মনোনয়ন বাতিলের নজির থাকায়, বিষয়টি এখন পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত