ফ্রিল্যান্সিংয়ের আড়ালে পর্নোগ্রাফির দুর্গ, ফেঁসে যাওয়া নারীরা অবরুদ্ধ

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম

কুষ্টিয়ায় ফ্রিল্যান্সিংয়ের আড়ালে গড়ে উঠা পর্নোগ্রাফি চক্রের চটকদারি বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হওয়া অসংখ্য তরুণী ব্লাকমেইলের শিকার হয়ে ওই চক্রের আস্তানায় অবরুদ্ধ হয়ে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মুখ খুললেই নেট দুনিয়ায় ভাইরাল করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বছরের পর বছর ধরে চক্রটি পর্নোগ্রাফি তৈরি করে আন্তর্জাতিক চক্রের কাছে বিক্রি করে আয় করছে কোটি কোটি টাকা। এই টাকার ভাগ যাচ্ছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু ব্যক্তি ও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের পকেটেও।

এভাবে চক্রটি অপরাধ সংঘটনস্থলের চারপাশে স্থানীয় ক্যাডার মোতায়েন করে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে অপরাধের স্বর্গরাজ্যের দুর্গ গড়ে তুলেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ‘ভাইরাল করে দেওয়া হবে’ চক্রটির এমন অব্যাহত হুমকির মুখে সামাজিকভাবে হেয় বা লোকলজ্জার কারণে ভুক্তভোগীরাও মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতির মধ্যে চক্রটির আস্তানায় অবরুদ্ধ থাকা এক ভুক্তভোগী ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুষ্টিয়া মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি ও অভিযোগ করেন।

কিন্তু পুলিশের কাছে প্রতিকার না পেয়ে অবশেষে কুষ্টিয়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালতে এই চক্রের মূলহোতা সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামের মৃত রিকাত আলীর ছেলে রফিকুল ইসলামসহ আরও দুই সহযোগীর নামোল্লেখ করে মামলা করেছেন শহরের এক ভুক্তভোগী পরিবার।

কুষ্টিয়া মডেল থানার সাধারণ ডায়েরি নং ১৪৫৩ তাং ২২/১১/২০২৫ ও লিখিত অভিযোগ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালতে করা না/শি পিটিশন মামলা নং ০১/২০২৬ সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর শহীদ হাসান ফয়েজ মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন বাসিন্দা নির্মাণ শ্রমিক মৃত রিকাত আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিনামূল্যে ফ্রি-ল্যান্সিং শেখানো হবে মর্মে চটকদারি পোস্ট দেখে কাজ শেখার আগ্রহ নিয়ে রফিকের সাথে পরিচয়। কখনও কুষ্টিয়া শহরের একটি সেন্টারে আবার কখনও তার হরিপুরের বাড়িতে কাজ শেখানোর কথা বলে মেয়েদের যোগাড় করে।

কম্পিউটার এবং মোবাইলের মাধ্যমে কাজ শেখানোর ছলে শারীরিক নৈকট্য তৈরি করে রফিক। অন্যদিকে সকলের অজান্তেই রফিকের সহযোগীরা ওই ঘটনাস্থলের ভিডিও চিত্র এবং স্থির চিত্র ধারণ করত। ওই সব ছবিগুলো গ্রাফিক্স ওয়ার্ক করে নানা ভাবে অশ্লীল দৃশ্য তৈরি করে টার্গেট করা মেয়েকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের বশে এনে তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তা ভিডিও ধারণ করে রফিক। এভাবে একের পর এক তরুণীকে বশে রেখে তাদের দিয়ে পর্নোগ্রাফি তৈরি করতে বাধ্য করে রফিক। সেগুলো অনলাইনে বিদেশে বিক্রি করে আয় করা বিপুল টাকার মালিক রফিক থানা পুলিশ থেকে শুরু করে সমাজের প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে তার অপরাধের স্বর্গরাজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।

আদালতে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইবুনালের বেঞ্চ সহকারী মখলেচুর রহমান জানান, ‘সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামের মৃত রিকাত আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম এবং তার অপর দুই সহযোগী আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে হাসান ও লিটুর ছেলে আকিবকে বিবাদী করে রুজু হওয়া মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন পিবিআইকে পাঠানো হয়েছে।’

রফিকের বাড়িতে অবরুদ্ধ থাকা এক তরুণী বলেন, ‘আমার কিছুই করার ক্ষমতা হচ্ছে না রফিকের বিরুদ্ধে। রফিক জালিয়াতি করে কি সব কাগজপাতি তৈরি করে আমাকে বলছে কোন প্রকার মুখ খুল্লেই সব ভিডিও নেটে ভাইরাল করে দিবে। কোন মেয়ে যখনই রফিকের কাজের প্রতিবাদ করে তখনই সে তাকে একই হুমকি দেয় এবং কৌশলে ডেকে এনে আটকে রাখে যাতে ওই মেয়ে বাইরে গিয়ে কাউকে কিছু বলতে না পারে।’

মামলার বাদি অবসর প্রাপ্ত এক সেনা সদস্যের স্ত্রী এবং ভুক্তভোগী এক তরুনীর মা’য়ের অভিযোগ, আমরা যখন ঘটনা জানতে পারি তখনই আমার মেয়েকে উদ্ধার করার জন্য থানা পুলিশের স্মরণাপন্ন হই। কিন্তু পুলিশ আমার মেয়েকে ওদের কব্জা থেকে উদ্ধার না করে উল্টা ওদের দেখানো ভুয়া একটা তালাক নামা দেখিয়ে পুলিশ কার্যত পর্নোগ্রাফি চক্রের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন। পরে আমি নিজেই রফিকের বাড়ি গিয়ে সেখানকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের স্মরণাপন্ন হয়ে রফিকের বাড়িতে আটকে রাখা আমার মেয়েকে উদ্ধারের অনুরোধ করি। সেখানেও স্থানীয়রা সবাই রফিকের পক্ষ নিয়ে আমার সাথে অসদাচরণ করেন তারা। ওই সময় ওখানে বিএনপি নেতা আমিরুল ইসলাম আন্টু, ফজু মেম্বার ও তার ছেলের নেতৃত্বে একটা সন্ত্রাসী বাহিনী আমাকে ঘিরে ধরেছিলো।

সুমন নামে অপর এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ‘ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতারণা করে আমার দুই সন্তানের মাকে ব্লাক মেইল করেছে। আমার স্ত্রী বিষয়টি টের পাওয়ার পর রফিকের সাথে বোঝাপড়া করার জন্য ওর বাড়িতে গেলে রফিক তাকেও আটকে রেখেছে। ঘটনা যা কিছুই হোক না কেনো আমি আমার কোমলমতি শিশু দুটির জীবনের কথা চিন্তা করে সবকিছু মেনে নিয়েও স্ত্রীকে ফিরে পেতে চাই’।

স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, মৃত রিকাত আলীর ৩ ছেলে যথাক্রমে হাফিজুল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও রফিকুল ইসলাম। ৩ জনেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তেমন কোন উল্লেখযোগ্য যোগ্যতা না থাকলেও গত ৫ বছর পূর্বে থেকে নেট ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। গ্রামের আলিশান বহুতল ভবন ছাড়াও কুষ্টিয়া শহরে শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে তাদের রয়েছে বিশালায়তনের বাণিজ্যিক স্পেস এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রে কয়েকটি উচ্চমূল্যের জমিও কিনেছে সম্প্রতি। প্রকাশ্যে তারা ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করেন বলে সমাজে প্রচার করলেও এর আড়ালে রয়েছে অধিক মুনাফা আয়ের কালো অধ্যায়। ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে অধিক চতুর এই পর্নোগ্রাফি নির্মাণের হোতা রফিক প্রযুক্তি ভিত্তিক অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার করে অসংখ্য ডিভাইস ও আইপি এ্যাড্রেস। কখন কোন আইপিতে কি কাজ করে তা আবিষ্কার করতে আইটি বেইসড এক্সপার্ট ফরেনসিক অনুসন্ধান ব্যতীত সম্ভব নয়।

তবে এবিষয়ে কথা বলতে রফিকুল ইসলাম রফিকের ব্যবহৃত তিনটি মুঠোফোন নম্বরে কল করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।   

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চেয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন মাতুব্বরের সাথে মুঠোফোনে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘বিবাদী রফিকুলের এসব অপরাধের প্রতিকার চেয়ে তার প্রথম স্ত্রী দুই সন্তানের মা জুলি খাতুন থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছিলেন। অভিযোগ তদন্তে একজন পুলিশ অফিসার তদন্ত শুরু করলে রফিক তা টের পেয়ে প্রথম স্ত্রী জুলি খাতুনকে দিয়ে সেই অভিযোগ আবার প্রত্যাহার করে নেয়ায় রফিকের বিরুদ্ধে আর কোন অভিযোগ না থাকায় পুলিশের কিছু করার ছিলো না। আদালতে মামলা হয়েছে বিষয়টি আমার জানা নেই। এবিষয়ে আদালতের কোন নির্দেশনা পেলে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করবে’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত