হতে চান রোনালদোর মতো, স্বপ্ন ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম

ইট-বালুর কাজ থেকে প্রিমিয়ার লিগের গোলমেশিন—ইগর থিয়াগোর গল্পটা যেন আধুনিক ফুটবলের এক রূপকথা। আজ তিনি ব্রেন্টফোর্ডের আক্রমণের মূল ভরসা, প্রিমিয়ার লিগে ব্রাজিলিয়ানদের মধ্যে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ডধারী। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে আছে সংগ্রাম, ক্ষুধা আর এক আকাশছোঁয়া স্বপ্ন—ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো হওয়া এবং একদিন ব্রাজিলের জার্সিতে বিশ্বকাপ খেলা।

২৪ বছর বয়সী থিয়াগো চলতি মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ইতোমধ্যে ১৬ গোল করেছেন। জানুয়ারির শুরুতে সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি পেছনে ফেলেছেন রবার্তো ফিরমিনো, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি ও মাথেউস কুনহার মতো তারকাদের। গ্যাব্রিয়েল জেসুস, রিচার্লিসন, কুতিনিয়ো, জুনিনহো কিংবা রবিনহোর মতো নামী ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডরাও যে কীর্তি গড়তে পারেননি, থিয়াগো সেটাই করে দেখিয়েছেন।

এই উত্থান কিন্তু হঠাৎ করে আসেনি। মাত্র তিন বছর আগেও তিনি ছিলেন প্রায় অপরিচিত এক ফরোয়ার্ড, খেলতেন বুলগেরিয়ার লুদোগোরেতস রাজগ্রাদের হয়ে। তখনও তার স্বপ্ন ছিল অনেক দূরের—শৈশবের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পথে হাঁটার।
“আমি যখন রোনালদোকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে খেলতে দেখতাম, সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তখনই নিজেকে বলেছিলাম—আমি তার মতো হতে চাই,” বলেন থিয়াগো।

লুদোগোরেতসের হয়ে গোল করে দলকে শিরোপা জেতাতে সাহায্য করেন তিনি। সেই পারফরম্যান্সই ২০২৩ সালে তাকে নিয়ে যায় বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুগে। সেখানেও থিয়াগোর গোলের ধার থামেনি। ইউরোপে নজরকাড়া সেই ফর্মই টানে ব্রেন্টফোর্ডের স্কাউটদের দৃষ্টি—যাদের “আড়ালে থাকা প্রতিভা” খুঁজে বের করার সুখ্যাতি আছে।

২০২৪ সালে ক্লাব-রেকর্ড ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডে থিয়াগোকে দলে নেয় ব্রেন্টফোর্ড। কিন্তু শুরুটা সুখের হয়নি। গুরুতর হাঁটুর চোটে প্রথম মৌসুমের বড় অংশই মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। অনেকেই তখন সন্দেহ করেছিল—এই ফরোয়ার্ড কি আদৌ প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকতে পারবেন?

চলতি মৌসুমে সেই সব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন গোল দিয়ে। নটিংহ্যাম ফরেস্টের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই গোল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে জোড়া গোল, লিভারপুলের বিপক্ষে জয়সূচক গোল—একটার পর একটা বড় ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি। এভারটনের বিপক্ষে করেছেন হ্যাটট্রিক, আর সান্ডারল্যান্ড ম্যাচে গড়েছেন ইতিহাস।

ব্রেন্টফোর্ড কোচ কিথ অ্যান্ড্রুজও স্বীকার করছেন, এমন উত্থান তিনি নিজেও কল্পনা করেননি। “সত্যি বলতে, কেউ যদি বলে সে আগে থেকেই জানত থিয়াগো এতটা ভালো হবে—সে পুরোপুরি সৎ নয়,” বলেন অ্যান্ড্রুজ। “সে অসাধারণ। আমি তাকে কারও সঙ্গে বদলাতে চাই না। আমাদের জন্য সে অমূল্য।”

এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি। থিয়াগোর বয়স যখন মাত্র ১৩, তখন বাবাকে হারান তিনি। সংসারের হাল ধরতে তখন তাকে কাজ করতে হয়েছে ইট-বালুর মিস্ত্রি হিসেবে, কখনও ফলের দোকানে। মা মারিয়া কাজ করতেন ময়লা পরিষ্কারের কর্মী হিসেবে, ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়ার কাছে গামা শহরে।

“আমার শুরুর জীবনটাই আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে,” বলেন থিয়াগো। “ছোট-বড় সব কিছুর মূল্য দিতে শিখেছি। আজ যখন নিজের জীবনের দিকে তাকাই, মনে হয় আমি সত্যিই ভাগ্যবান।”

থিয়াগোর গোলের জোয়ারে ভর করে প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট টেবিলে পাঁচ নম্বরে উঠে এসেছে ব্রেন্টফোর্ড। চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলার স্বপ্নও উঁকি দিচ্ছে—চেলসির চেয়ে দুই পয়েন্ট এগিয়ে আছে তারা। স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজর পড়ছে এই ব্রাজিলিয়ানের ওপর; শোনা যাচ্ছে, আর্সেনালও আগ্রহী।

তবে থিয়াগোর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ক্লাব ফুটবল নয়। তিনি চান সেলেসাওর জার্সি গায়ে চাপাতে, খেলতে চান বিশ্বকাপ। যদিও এখনো ব্রাজিলের হয়ে কোনো ম্যাচ খেলেননি—এমনকি বুলগেরিয়ান পাসপোর্টও আছে তার—তবু বিশ্বাস হারাননি। “প্রিমিয়ার লিগে খেলার স্বপ্ন সব সময়ই ছিল,” বলেন তিনি। “অনেকে সন্দেহ করেছিল আমি পারব না। আমি তাদের ভুল প্রমাণ করতে চেয়েছি।”

তারপর দৃঢ় কণ্ঠে যোগ করেন, “ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা—এটাই আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। আমি সেখানে পৌঁছাবই। সেদিন মনে হবে, আমি সত্যিই পেরেছি।”

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত