নরসিংদীতে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়িসহ খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজিরা অপরাধমূলক কর্মকা- বাড়ছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের প্রকাশ্য ব্যবহারে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এমন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জেলাবাসী। গত এক বছরে জেলায় ৯৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব খুনের ঘটনায় ৯৪টি হত্যা মামলা দায়ের হলেও অধিকাংশ আসামি রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এছাড়া গত এক বছরে জেলায় ১৭টি ডাকাতি, ১৮৪টি চুরি, ৮৫টি ধর্ষণ এবং ৪৩টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
অপর দিকে গত দেড় বছরেও উদ্ধার হয়নি নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্রের মধ্যে ২৭টি অগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ হাজার ৩৩৬ রাউন্ড গুলি। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অবৈধ বালু ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনায় ব্যবহার হচ্ছে এসব অস্ত্র ও গুলি। ঘটেছে একাধিক হত্যাকা- এবং বন্দুকযুদ্ধ। এমন পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছেন সচেতন মহল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, গত এক বছরে বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২০০ রাউন্ড গুলি। এসব ঘটনায় ২৭টি নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ৫৬ জন।
এদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন এলাকায় অপরাধীদের গুলিতে নিহত হন। তাকে গুলি করা সে অস্ত্রটিও গত ১৬ ডিসেম্বর রাতে নরসিংদী শহর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। র্যাবের দেওয়া তথ্যমতে, দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, একটি খেলনা পিস্তল ও ৪১ রাউন্ড গুলি সেদিন উদ্ধার করা হয়।
রায়পুরা উপজেলার চরাঞ্চলের বাঁশগাড়ী ও সায়দাবাদ গ্রামে অপরাধীরা প্রকাশ্যে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে। এছাড়া অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র হাতে সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে রায়পুরা উপজেলার অপরাধপ্রবণ এলাকা বাঁশগাড়ী ও সায়দাবাদ গ্রামের দুই চিহ্নিত সন্ত্রাসীর হাতে তিনটি রাইফেল। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মনে দেখা দেয় নানা প্রশ্ন। ভয়ে এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। জুলাই যোদ্ধা ও ছাত্র সংগঠক জান্নাতুল ফেরদৌস মালিহা বলেন, জেলা জুড়ে অবৈধ অস্ত্রের যে আতঙ্ক সেটা তো জনমনে রয়েছেই। নতুন করে কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে অনেকগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি। নির্বাচনকে ঘিরে এসব অস্ত্র ও গুলি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, স্থানীয় ও জাতীয় প্রায় প্রতি নির্বাচনেই নরসিংদী সদর ও রায়পুরা উপজেলার চরাঞ্চল হয়ে ওঠে অশান্ত, বাড়ে অস্ত্রের ব্যবহার। লুট হওয়া অস্ত্রসহ জেলার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলছে। মানুষের মনে দেখা দিয়েছে নানা রকম ভীতি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন-এর নরসিংদী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হলধর দাস বলেন, কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিভিন্ন হাত ঘুরে অপরাধীদের হাতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বলে বিভিন্নভাবে আমরা শুনছি। আর এসব অস্ত্র এখন ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও আমরা মনে করছি। না হলে এত অস্ত্রের ঝনঝনানি কেন? লুট হওয়া অস্ত্র পুরোপুরি উদ্ধার না হলে নির্বাচন নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নরসিংদী পরিদর্শনে এসে নরসিংদীর চরাঞ্চলে বিশেষ অভিযানের নির্দেশ দেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানে কিছুসংখ্যক অবৈধ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এছাড়া বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবির খোকন ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইনের নেতৃত্বে নরসিংদী সদরের চরাঞ্চল আলোকবালীতে একটি শান্তি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ওই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নতুন করে কোনো সংঘাতের সৃষ্টি হয়নি। জেলা প্রশাসন ও জেলা বিএনপির এহেন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সাধারণ মানুষ।
তবে নির্বাচনের আগেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন নরসিংদীর পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ্-আল-ফারুক। তিনি বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলি বেশিরভাগ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি লুট হওয়া অস্ত্রসহ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলমান রয়েছে। অপরাধ নির্মূলে আমরা প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধিসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব অভিযানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এছাড়া নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে মাদক উদ্ধার ও শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
নরসিংদী জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব, প্রশাসন সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। চরাঞ্চলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ কম্বিং অপারেশন চালিয়ে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার করছে। আমরা আশা করছি নির্বাচনের আগেই জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভোটের উপযোগী থাকবে।
