যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এড়াতে তৎপর উপসাগরীয় দেশগুলো

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪১ এএম

ইরানে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির উত্তেজনা ক্রমশই বাড়ছে। বিক্ষোভ পরিস্থিতি কিছুটা বদলালেও, ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপসহ নানা বিকল্প নিয়ে ভাবছে ট্রাম্প। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইরানে হামলার হুমকি দেওয়ায় ব্যাপক জলঘোলা হয়েছে এবং তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ট্রাম্পের চাপের মুখে ৮০০ ফাঁসি স্থগিত করেছে ইরান। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র গত বৃহস্পতিবার পাঁচ ইরানি কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে নেপথ্যে থেকে ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনের পরিকল্পনা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে উপসাগরীয় দেশগুলো কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। এদিকে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪২৮ জনে। নরওয়েভভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে।

ইরানে দেশব্যাপী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে আরব উপসাগরীয় দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার যে হুমকি দিয়েছেন, তাতে পুরো অঞ্চলটি বড় ধরনের বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ওই অঞ্চলের দেশগুলো। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে পর্দার আড়ালে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে সৌদি আরব, কাতার ও ওমান। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, সৌদি আরব ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের ওপর হামলা না চালানোর জন্য তদবির করছে। অন্যদিকে, কাতার ও ওমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্রর কর্মকর্তাদের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্ব দিচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, গত বুধবার ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ ভেঙে পড়ার এবং হামলা আসন্ন এমন খবরের পর উত্তেজনা প্রশমনে এই তিন দেশ সর্বোচ্চ স্তরের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যানা জ্যাকবস খালাফ বলেন, সবাই অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিল কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রথাগত যোগাযোগের পথগুলো অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যবহার করা হচ্ছিল না। দোহার দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম বলেন, জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) কর্মকর্তারা জানতেন না যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য আসলে কী। ইরানে হামলার হুমকির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের নির্দেশে দেশটির বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ এবং এর সঙ্গে থাকা ‘স্ট্রাইক গ্রুপ’ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।

ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে সহিংস পরিকল্পনার অভিযোগে দেশটির পাঁচ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থ দপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি, ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কমান্ডারসহ মোট পাঁচ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এই কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ দমনের ‘মূল রূপকার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের ওপর চাপ বজায় রাখার মধ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হলো। যুক্তরাষ্ট্র আরও বলেছে, ইরানি নেতাদের অর্থ আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোয় পাঠানো হচ্ছে কি না, সেদিকে তারা নজর রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র ফারদিস কারাগারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, এ কারাগারে নারীরা ‘নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অপমানজনক আচরণের’ শিকার হয়েছেন।

ইরানে চলমান সহিংস বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির প্রেক্ষাপটে জরুরি বৈঠক করেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একে অন্যের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দেন। বৈঠকে ইরানের উপ-জাতিসংঘ প্রতিনিধি বলেন ইরান সংঘাত চায় না, তবে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে। তিনি অভিযোগ করেন, ইরানে অস্থিরতা উসকে দিতে ওয়াশিংটন সরাসরি জড়িত। অন্যদিকে, জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলেন বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা থেকেই বোঝা যায়, ইরান সরকার জনগণ ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভীত। ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সেখানে সরকারের দমনপীড়নের প্রকৃত চিত্র জানা কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি। আর জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব মার্থা ইরানকে আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করার আহ্বান জানান।

এদিকে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারে। নরওয়েভভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা বলছে, বিক্ষোভে প্রায় ৩ হাজার ৪২৮ জন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে তেহরানে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় দুইশ শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ৮ থেকে ১২ জানুয়ারির মধ্যেই তিন হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহতদের বড় অংশই তরুণ, যাদের অনেকের বয়স ত্রিশের নিচে। কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক ধরপাকড় চলছে। ইন্টারনেট প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত