চিকিৎসক সংকটে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ভোগান্তিতে রোগীরা

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:২৯ পিএম

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি বর্তমানে নিজেই যেন ‘রোগাক্রান্ত’ হয়ে পড়েছে। জনবল সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে ৫০ শয্যার এই সরকারি হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা এখন খাদের কিনারায়। গত ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান অপারেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সব অস্ত্রোপচার। ফলে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন উপজেলার প্রায় দেড় লাখ সাধারণ মানুষ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯টি জুনিয়র কনসালটেন্ট পদের বিপরীতে কাগজে-কলমে ১০ জন থাকলেও বাস্তবে সেই সংখ্যা অনেক কম। মেডিসিন, অর্থোপেডিক, চক্ষু, চর্ম ও যৌন এবং নাক-কান-গলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ৭টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এর ওপর আবার দায়িত্বরত চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ বিনা ছুটিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আলাউদ্দিন এবং প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ ডা. নাবিলা নুজহাত দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে নেই। ডা. আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে তো বিভাগীয় মামলাও চলছে। এমনকি হাসপাতালের প্রধান অভিভাবক, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজেই অসুস্থতার কারণে অধিকাংশ সময় ছুটিতে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখা দিয়েছে গাইনি ও প্রসূতি বিভাগে। অভিযোগ উঠেছে, জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি) ডা. সাবরিনা মেহের গত বছরের জুন মাস থেকে প্রায় স্থায়ীভাবে অনুপস্থিত। যদিও তিনি দাবি করেছেন ওটি (অপারেশন থিয়েটার) প্রস্তুত না থাকায় তিনি কাজ করতে পারছেন না, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে ভিন্ন কথা। 

আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শরীফ ইসলাম জানান, ওটি পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে, চিকিৎসক নিয়মিত এলেই একদিনের মধ্যে অপারেশন শুরু করা সম্ভব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কর্মীরা জানান, ডা. সাবরিনা মাসে বড়জোর একদিন বা দুই দিন আসেন, কিন্তু কোনো রোগী না দেখেই চলে যান। বর্তমানে তার বেতন বন্ধ থাকলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।

ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এই হাসপাতালে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনার অসংখ্য রোগী আসেন। কিন্তু ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে আশঙ্কাজনক রোগীদের রাজবাড়ী বা ফরিদপুর রেফার করতে হচ্ছে। পথেই অনেকের মৃত্যু ঘটছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। প্রতিদিন বহির্বিভাগে আসা ৪০০-এর বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছেন উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসাররা, যা রোগীদের আস্থার সংকটে ফেলছে।

আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শরীফ ইসলাম বলেন, "মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এখানে শুধু গোয়ালন্দ নয়, পার্শ্ববর্তী রাজবাড়ী সদরের মানুষও চিকিৎসার জন্য আসেন। সড়ক দুর্ঘটনার রোগীর চাপ এখানে সবসময়ই বেশি থাকে। আমাদের শয্যা সংখ্যা ৫০ হলেও রোগীর চাপে অনেক সময় মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। সরকারিভাবে আমরা চাহিদার মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ করতে পারছি, বাকিটা রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। অপারেশন থিয়েটার প্রসঙ্গে বলব—দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সেখানে ধুলোবালি জমেছে ঠিকই, কিন্তু গাইনি ডাক্তার চাইলে আমরা মাত্র এক দিনেই ওটি পরিষ্কার করে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুত করতে পারি। এছাড়া তিনি অপারেশন না করলেও তো আউটডোরে রোগী দেখতে পারতেন, কিন্তু তিনি সেটাও করছেন না। আমরা আশাবাদী, ৪৮তম বিসিএস থেকে নতুন নিয়োগ সম্পন্ন হলে এই জনবল সংকট অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।"

​তবে স্থানীয় সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু নতুন নিয়োগ নয়, বরং যারা নিয়োগ পেয়েও কর্মস্থলে আসছেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত অপারেশন থিয়েটার সচল করে গরিব রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত