বিয়েবিচ্ছেদের কারণ ও প্রতিকার

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪০ এএম

বিয়ের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের সূচনা হয়। এই দাম্পত্য সম্পর্ক অটুট থাকা এবং আজীবন স্থায়ীত্ব লাভ করা কাম্য। স্বামী-স্ত্রীর কেউ কখনো বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চেষ্টা করবে না এবং বিয়েবিচ্ছেদের পরিস্থিতিও সৃষ্টি করবে না। কেননা বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হলে এর কুপ্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং গোটা পরিবারটিই তছনছ হয়ে যায়, সন্তান-সন্ততির জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কখনো আবার তা বংশীয় কোন্দলেও পরিণত হয়। যে সব কারণে দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয় সেগুলো দূর করার জন্য কোরআন-হাদিস অনেক নির্দেশনা দিয়েছে।

বৈবাহিক জীবন ভাঙনের পেছনে সাধারণত একক কোনো কারণ কাজ করে না, বরং সময়ের সঙ্গে জমে ওঠা নানা সমস্যা একপর্যায়ে বিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দেয়। দাম্পত্য জীবনে সাধারণত যেসব কারণে বিচ্ছেদ ঘটে, সেগুলো উল্লেখ করা হলো।

শ্রদ্ধাবোধের অভাব : স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা কমবেশি হতে পারে। কিন্তু শ্রদ্ধা না থাকলে সম্পর্ক টেকে না। কথায় কথায় অপমান, অবমূল্যায়ন বা উপেক্ষা দাম্পত্যে দূরত্ব বাড়ায়।

আস্থা না রাখা : স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা, কোনো কথা বা কাজে বিশ্বাস না করা। এগুলো পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতিতে বিরাট প্রভাব ফেলে।

পারিবারিক সহিংসতা : শারীরিক, মানসিক কিংবা অর্থনৈতিক সহিংসতা দীর্ঘদিন সহ্য করা অসম্ভব। একসময় আত্মসম্মান ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

একে অপরের হক আদায় না করা : একজন স্ত্রীর ওপর যেমন স্বামীর হক রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে স্বামীর ওপরও স্ত্রীর হক রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের হক যদি যথাযথ আদায় করে তাহলে তাদের সম্পর্কে কখনো ভাটা পড়বে না।

চাহিদার অপূর্ণতা : খোলামেলা আলোচনা না হওয়া, চাহিদার অমিল বা দীর্ঘদিনের অসন্তুষ্টি সম্পর্ককে ধীরে ধীরে শীতল করে দেয়।

দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক টানাপড়েন : অভাব একা মানুষকে ভাঙে না, কিন্তু অভাব থেকে জন্ম নেওয়া চাপ, ঝগড়া ও হতাশা দাম্পত্যে ফাটল ধরায়।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক : দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত আসে বিশ্বাসভঙ্গ থেকে। একবার আস্থা নষ্ট হলে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটিই বিচ্ছেদের প্রধান কারণ হিসেবে বেশি দেখা যায়।

মানসিক রোগ ও আসক্তি : ব্যক্তিত্বগত সমস্যা, মাদকাসক্তি বা অন্যান্য মানসিক রোগ সঠিক চিকিৎসা ও সহযোগিতা না পেলে সম্পর্ককে ভেঙে দেয়।

বিচ্ছেদ হঠাৎ ঘটে না। এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, বোঝাপড়ার ঘাটতি ও সমস্যার সমাধান না করার ফল। সময় মতো সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং প্রয়োজনে পেশাদার পরামর্শ নিলে অনেক সম্পর্কই টিকে যেতে পারে।

সন্তানের বিষয় নিয়ে মতানৈক্য : সন্তানের শিক্ষা, ভবিষ্যৎ, শাসন বা দায়িত্ব নিয়ে মতভেদ অনেক সময় দাম্পত্য কলহকে তীব্র করে তোলে।

বিচ্ছেদ প্রতিকারে করণীয় : ইসলাম শুধু অধিকারের কথা বলে না, কর্তব্যের কথাও বলে। স্বামী ও স্ত্রী প্রত্যেকেরই রয়েছে কর্তব্য ও অধিকার। নিজের কর্তব্য পালন আর অন্যের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হলেই দাম্পত্য জীবনে শান্তি আসে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘স্ত্রীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের প্রতি (স্বামীদের) অধিকার রয়েছে। (সুরা বাকারা ২২৮)

এখানে দেখা যাচ্ছে, নারীর যেমন কর্তব্য আছে, তেমনি অধিকারও আছে। একই কথা পুরুষের ক্ষেত্রেও। তাই পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়কে নিজ নিজ কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং একে অপরের হক ও অধিকারের বিষয়ে শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

একজন স্বামী যখন দাম্পত্য জীবন ভাঙনের আভাস পাবে তখন প্রথমে বুঝিয়ে-শুনিয়ে সমাধান করার চেষ্টা করবে। এরপর স্ত্রীর সঙ্গে শয্যা ত্যাগ, সতর্ক করা, শাসন করার পথ অবলম্বন করবে। এতটুকুতে মীমাংসা না হলে উভয় পক্ষে দুজন শালিস নিযুক্ত করে একটি চূড়ান্ত ফয়সালায় উপনীত হবে। এগুলো হলো দাম্পত্য জীবনে ইসলামি হেদায়েতের অনন্য বৈশিষ্ট্য। এগুলো পালন করলে দাম্পত্য জীবন অবশ্যই অটুট থাকবে।

ইসলামের নির্দেশনা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত বৈবাহিক সম্পর্ক রক্ষায় প্রয়াসী হওয়া। তালাক ও বিয়েবিচ্ছেদের পর্যায়টি হচ্ছে সর্বশেষ পর্যায়, যা একান্ত অনিবার্য প্রয়োজনের স্বার্থেই বৈধ করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য হতে পারে, ঝগড়া-বিবাদ হতে পারে, তা নিজেরাই মিটমাট করে নেওয়া চাই, যদি তা বড় আকার ধারণ করার আশঙ্কা হয় তখন দুই পরিবার আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা করলে তার (স্বামীর) পরিবার থেকে একজন এবং তার (স্ত্রী) পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত। (সুরা নিসা ৩৫)

পরিবার সমাজের মূল ভিত্তি, আর দাম্পত্য জীবন সেই ভিত্তির কেন্দ্রবিন্দু। দাম্পত্য সম্পর্কে বিচ্ছেদ হলে সেই ভিত্তি নড়ে যায়। তাই সাময়িক রাগ, অভিমান কিংবা সংকটকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়ার আগে আত্মসমালোচনা, ধৈর্য ও বোঝাপড়ার পথ অবলম্বন করা জরুরি। ইসলাম দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, ন্যায় ও পারস্পরিক সম্মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। সংকট দেখা দিলে সংলাপ, উপদেশ ও সালিশের মাধ্যমে সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছে, যেন সম্পর্ক ভাঙার আগেই তা রক্ষা করা যায়। বৈবাহিক সম্পর্ক রক্ষায় আন্তরিক চেষ্টা চালানোই মুমিনের দায়িত্ব। কারণ শান্ত ও স্থিতিশীল দাম্পত্য জীবনই পরিবারকে নিরাপদ রাখে, সন্তানকে সঠিক পথে গড়ে তোলে এবং সমাজে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে।

লেখক : সহকারী শিক্ষা সচিব, মাদ্রাসা আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও, ঢাকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত