ডা. শফিকুর রহমান

ফ্যামিলি কার্ডের ২০০০ টাকায় একটা পরিবারের কিছুই হবে না

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:২২ পিএম

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এই দেশে আর ফ্যাসিবাদের ছায়া চাই না। যদি আসে, পূর্বের মতো পরিণতি হবে। জামায়াত আর কোনও ভোট ডাকাত দেখতে চায় না।

আজ শুক্রবার দুপুরে পঞ্চগড় চিনিকল মাঠে আয়োজিত ১০ দলীয় জোট আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।

জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, দেশে ইনসাফ থাকলে দুর্নীতি ও টাকার পাচার হতো না। আওয়ামী শাসনামলে আয়নাঘর তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হয়েও রেহাই পায়নি অনেকে।

জনগণ এবার গণভোটে হ্যাঁ-কে জয়যুক্ত করতে মুখিয়ে আছে জোর দিয়ে তিনি বলেন, জামায়াত কারও কাছ থেকে চাঁদা নেবে না, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং গণভোটে হ্যাঁকে জয়যুক্ত করবে।

সভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেশ চলে। ট্যাক্সের বাইরে কিন্তু একটা বেসরকারি ট্যাক্স আছে। প্রত্যেকটা মুদির দোকানে, রাস্তাঘাটে, হকারের কাছে, এমনকি রাস্তার পাশে বসে যে ভাই-বোনটি ভিক্ষা করে, তার কাছ থেকেও একটি ট্যাক্স নেওয়া হয়। ওই ট্যাক্সের টাকা আমরা আমাদের জনগণের হাতে তুলে দিতে চাই না। না, শুধু তাই না, ওই ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হবে। ওই ট্যাক্স নামের চাঁদাবাজি আর চলবে না।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সমালোচনা জামায়াত আমির বলেন, আমরা ওই ধরনের কোনও কার্ডের ওয়াদা দিচ্ছি না। দুই হাজার টাকা দিয়ে একটা পরিবারের কোনও কিছু সমাধান হবে না।

জনসভায় মঞ্চে থাকা জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন দলটির আমির। এ সময় তিনি পঞ্চগড়-১ আসনে জোটের প্রার্থী এনসিপির সারজিস আলম ও পঞ্চগড়-২ আসনের জোটের প্রার্থী জামায়াতের সফিউল আলম সুফিকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে শাপলা কলি ও দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানান।

ভোট ডাকাতদের কারণে বিগত ১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি এবং দেশের মানুষ নতুন কোনও ভোট ডাকাত দেখতে চায় না উল্লেখ করে জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, আর এই দেশে ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ এখন যদি নতুন কোনো জামা পরে আমাদের সামনে আসে, ৫ আগস্ট যে পরিণতি হয়েছিল, সেই নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদের একই পরিণতি হবে।

জামায়াত আমির বলেন, যারা নিজেদের দলের লোকদের চাঁদাবাজি, দখল–বাণিজ্য, মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, পাথর মেরে লোক হত্যা, গাড়িচাপা দিয়ে লোক হত্যা থেকে বিরত রাখতে পারবে, তারাই জনগণকে আগামীর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। যারা এগুলো পারবে না, তারা যত রঙিন স্বপ্নই দেখাক, জাতি তাদের মতলব বুঝতে পারবে।

অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনুরোধ করে শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের যে কষ্ট সবাই মিলে ভোগ করতে হয়েছে, সেই কষ্ট যেন এসব দল জনগণকে না দেয়। তবে অনেকে দিচ্ছে, সেটি যেন বন্ধ হয়। আর বন্ধ না হলে ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ দুটি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবে আর অনেকগুলো ‘না’ ভোট দেবে।

এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, জনগণ একটা হ্যাঁ ভোট দেবে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়, ঘুণে ধরা রাজনীতির কাঠামো পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়। জনগণ মুখিয়ে আছে, এ জন্য জনগণ গণভোটে হ্যাঁ বলবে। জনগণ আরেকটি হ্যাঁ ভোট দেবে দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে।

শফিকুর রহমান আরও বলেন, ১০ দলীয় সমঝোতার জোটকে বিজয়ী করার মানে আধিপত্যবাদ, চাঁদাবাজ, দখলদার, ফ্যাসিবাদ, ব্যাংক ডাকাত, মা-বোনদের ইজ্জতের ওপরে যারা হাত দেয়, তাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ ভোট যুবকদের দক্ষ করে তোলা হবে। তাদের হাতে খয়রাতি অনুদান তুলে দিয়ে অপমান করা হবে না।

জামায়াত আমির ঘোষণা করেন, ‘চাঁদা আমরা নেব না এবং চাঁদা কাউকে নিতে দেব না। আমরা বলেছি, দুর্নীতি আমরা করব না এবং দুর্নীতি কাউকে করতেও দেব না। আমরা বলেছি, ইনসাফ প্রত্যেকের জন্য জাতি, ধর্ম, দল–নির্বিশেষে নিশ্চিত করা হবে। ইনসাফ এখন থেকে আর টাকার মূল্যে বিক্রি হবে না।

ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার। এমন বাংলাদেশ গড়তে ১০ দলের প্রতীকের পক্ষে সর্বশক্তি নিয়োগ করে গণভোটে হ্যাঁ এবং প্রতীকে হ্যাঁ দিতে হবে।

জামায়াত আমির বলেন, জামায়াত নারীদের সম্মানের জায়গায় রাখতে চায়। কর্মক্ষেত্রে তারা সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবে, তাদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। রাস্তাঘাটে তাদের চলাফেরায় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করছে জামায়াত। তার জন্য যা করার দরকার, ক্ষমতায় যেতে পারলে সব করা হবে। যারা এর বাইরে আজেবাজে কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, মা-ভাইয়েরা তাদের জবাব দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির আরও বলেন, আমরা কিছু বন্ধুকে বলতে চাই, মেহেরবানি করে মা–দের ইজ্জত নিয়ে কখনো টান দিবেন না। তাহলে আগুন জ্বলবে কিন্তু। সব সহ্য করব, মা–দের ইজ্জতের ব্যাপারে বরদাশত করব না।

শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদিকে স্মরণ করে শফিকুর রহমান বলেন, তার কণ্ঠ ছিল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে, যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে। যারা তা চায় না, তারাই তাকে শেষ করে দিয়েছে। হাদি হারিয়ে যায়নি। সে ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে
জনসভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম।

ডা. শফিকুর রহমান উন্নয়নের প্রচলিত ধারা পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, এতদিন উন্নয়ন টেকনাফ থেকে শুরু হয়ে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতো না। এখন থেকে উন্নয়ন হবে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফরঅভিমুখে, যাতে সারা দেশে উন্নয়নের একটি ভারসাম্য বজায় থাকে। এই লক্ষ্যে নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে শক্তিশালী করার গুরুত্বারোপ করেন।

উত্তরবঙ্গের তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া নদীর করুণ দশার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নদীগুলো আজ মরে কঙ্কাল হয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। তিনি নদীগুলোকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন,  ১০ দলীয় জোট সরকার গঠন করতে পারলে শুধু নদীর জীবনই নয়, মানুষের জীবনেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে।

জামায়াত আমির বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য মানুষকে যেন আর রাজধানীমুখী হয়ে রাস্তায় প্রাণ হারাতে না হয়, সেজন্য দেশের ৬৪টি জেলাতেই মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে। এই পঞ্চগড়েও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য মেডিকেল কলেজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। 

জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক ইকবাল হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় পঞ্চগড়-১ আসনের জোটের প্রার্থী এনপসিপির সারজিস আলম, পঞ্চগড়-২ আসনের জামায়াতে প্রার্থী সফিউল আলম সুফি, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দলোয়ার হোসেন, জোটের শরিক দল জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধানসহ জোটের নেতারা বক্তব্য দেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত