পরিবেশ সবার জীবন আমার

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০৮ এএম

বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ বিপর্যয় কোনো কাল্পনিক বা দূরবর্তী কোনো সমস্যা নয়। এটি এখন দৈনন্দিন জীবনের এক রূঢ় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং অসময়ে বন্যা ফসলি জমি ভাসিয়ে নিচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় জনপদকে গ্রাস করছে। এসব ঘটনাকে কেবল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, এই বিপর্যয়ের মূল কারণ মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড। তবে সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা প্লাস্টিক বর্জন বা গাছ লাগানোর মাধ্যমে যতটুকু ভূমিকা রাখতে পারি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রভাব ফেলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি এখন আর কেবল সামাজিক সচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একটি দেশের পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তা নির্ভর করে সেই দেশের নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতার ওপর। রাজনীতি ও পরিবেশকে অনেকে আলাদা করে দেখতে চান। কিন্তু আদতে এ দুটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও শিল্পায়ন নীতি সরাসরি প্রকৃতির ওপর প্রভাব ফেলে। যখন কোনো সরকার বা নীতিনির্ধারক মহল পরিবেশকে উপেক্ষা করে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দেন তখন দীর্ঘমেয়াদে তা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হয়। তথাকথিত উন্নয়নের দোহাই দিয়ে বন উজাড় করা বা নদী ভরাট করার প্রবণতা আমরা প্রায়শই লক্ষ করি। এসব প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা থাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে। তাই পরিবেশ ধ্বংসের দায়ভারও তাদের ওপরই বর্তায়।

শহরাঞ্চলের পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে তাকালে আমরা নীতিনির্ধারণী দুর্বলতার চিত্রটি স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আমাদের শহরগুলোকে একেকটি হিট আইল্যান্ডে পরিণত করেছে। জলাশয় ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার সময় শহরের তাপমাত্রা বা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের কথা ভাবা হয়নি। এসব প্রকল্প রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বা নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই বাস্তবায়িত হয়েছে। শহরের বাতাস আজ বিষাক্ত এবং এর প্রধান কারণ ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও কলকারখানার কালো ধোঁয়া। এসব নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইন আছে কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই অরাজকতা বন্ধ করা কঠিন কিছু ছিল না। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক না করে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার উৎসাহিত করার নীতিও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। একটি জনবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব নগরী গড়তে হলে রাজনৈতিক দর্শন ও পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীর মৃত্যু এখন এক সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। নদীর তীর দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বা নদীতে শিল্পবর্জ্য ফেলার ঘটনা অহরহ ঘটছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকে ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যায় না।

উন্নত দেশগুলো তাদের শিল্পস্বার্থ ক্ষুন্ন হবে বলে কার্বন নিঃসরণ কমাতে গড়িমসি করে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোও উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয়ে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে পুরোপুরি ঝুঁকতে পারছে না। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে আমাদের নীতিনির্ধারকদের আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। কেবল ক্ষতিপূরণ দাবি করাই যথেষ্ট নয়। দেশের অভ্যন্তরেও পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে হবে যে আমরা পরিবেশ রক্ষায় আন্তরিক। জলবায়ু তহবিল থেকে পাওয়া অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব। দুর্নীতির কারণে অনেক সময় এই তহবিলের সুফল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছায় না যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। পরিবেশ আইন ও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা আরেকটি বড় বাধা। পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। পরিবেশ আদালতগুলোকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা প্রয়োজন। আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বনভূমি রক্ষা ও বনায়ন কর্মসূচির ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। সামাজিক বনায়নের নামে অনেক সময় প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে বিদেশি দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগানো হয়। এটি জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন তবে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। তরুণ প্রজন্ম এখন পরিবেশ নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা চায় তাদের নেতারা পরিবেশ রক্ষায় কঠোর হোক। গ্রিন পলিটিক্স এখন সময়ের দাবি। এর অর্থ হলো প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশকে কেন্দ্রে রাখা। বাজেট প্রণয়নের সময় পরিবেশ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং দূষণকারী শিল্পের ওপর উচ্চ হারে কার্বন ট্যাক্স আরোপ করা প্রয়োজন।

পরিবেশ রক্ষায় জনগণের সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তা ছাড়া কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। পরিবেশ রক্ষার লড়াইটি এখন আর কেবল পরিবেশবাদীদের লড়াই নয়। এটি আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে প্রকৃতি ধ্বংস করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না। প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে জানে এবং সেই প্রতিশোধ অত্যন্ত নির্মম হয়। পরিবেশ বিপর্যয় রোধে রাজনীতি ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকাই মুখ্য। তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত লাখো-কোটি মানুষের জীবন ও প্রকৃতির ভাগ্য নির্ধারণ করে। তাই তাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে। স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক লাভের আশায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে পরিবেশ সুরক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। জনগণ চায় তাদের নেতারা পরিবেশের বন্ধু হোক। সুস্থ পরিবেশেই কেবল একটি সুস্থ জাতি ও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। তাই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই, নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে, এর খেসারত দিতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তখন কাউকে দায়ী করে পার পাওয়া যাবে না। এই কারণেই বলি জীবন আমার, পরিবেশ কিন্তু সবার।

লেখক : পরিবেশবাদী লেখক সংগঠক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত