চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হবে? 

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৬ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। আর মাত্র কয়েকদিন। এরপর অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন। যেটা ঘিরে দেশের মানুষ অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষায় রয়েছেন। যে দেশটি হাজারো সমস্যায় জর্জরিত, সেই দেশটি বিনির্মাণে রাষ্ট্রনায়ককে বেশ বেগ পেতে হয়। মানুষের যেখানে মৌলিক চাহিদা উপেক্ষিত, সেখানে অন্যান্য চাহিদা তুচ্ছ। তবে মৌলিক চাহিদাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। বহুদিন ধরে বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, স্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ খাত। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন করতে হলে বাংলাদেশের জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হবে এই খাতে। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ মাত্র ১ শতাংশের সামান্য বেশি। সংবিধানে স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, এখনো প্রত্যেক মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা পান না। সব আমলা এবং জাতীয় সংসদ সদস্যদের চিকিৎসা বিদেশে নয়, দেশেই নিশ্চিত করতে হবে। তখনই হয়তো সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশে ২০১৮ পর্যন্ত, বাংলাদেশে চিকিৎসকের সংখ্যা প্রতি হাজারে ০.৬ জন। প্রতি হাজার মানুষের জন্য নার্সের সংখ্যা ০.৪ জন। সংস্থাটির মতে চলনসই সংখ্যা হলো প্রতি হাজারে অন্তত ১ জন। এই সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য পরিমাণ কম। ডাক্তার ও রোগীর আনুপাতিক তুলনায় নির্দিষ্ট করতে হবে। যেখানে একজন ডাক্তারকে তার সামর্থ্যরে তুলনায় অধিক রোগী দেখতে না হয়। যদি বেশি দেখতেও হয় তা যেন তার সামর্থ্যরে মধ্যেই থাকে। নিশ্চিত করতে হবে কোনো সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার কোনো অবস্থাতেই প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী না দেখেন এবং পার্টটাইম চাকরি না করেন। তবে ডাক্তার যেন টাকা কামানোর মেশিন না হন, তাহলেই মানসিকভাবে প্রশান্তিতে থাকবেন ডাক্তার ও রোগী। রোগী এবং ডাক্তারের আনুপাতিক হার বর্তমান সময়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু কীভাবে!

আমি প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন মানুষ। ছোটবেলায় দেখতাম, পুরো ইউনিয়নে একজন পল্লী চিকিৎসক চিকিৎসা দিতেন। নাম তার সুরুজ আলী। এক চোখে সমস্যা থাকলেও চিকিৎসক হিসেবে বেশ পারদর্শী ছিলেন। রোগীর সঙ্গে তিনি অসম্ভব আন্তরিক ছিলেন। তার চিকিৎসায় অধিকাংশ রোগী ভালো হতো। তিনি যদি বুঝতেন তার চিকিৎসায় রোগী ভালো হবে না, তিনি সরাসরি রেফার করতেন সদর হাসপাতালে অথবা রংপুর মেডিকেলে। তিনি যদি বলতেন, এ রোগী নাও বাঁচতে পারেন, সত্যি তাই ঘটত। কিন্তু বর্তমানে যে সমস্ত পল্লী চিকিৎসক রয়েছেন, তাদের ডিসপেন্সারি ডাক্তার বলা যেতে পাড়ে। ডিস্পেন্সারি ডাক্তারগুলো নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করার জন্য খুব সহজেই রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক সাজেস্ট করেন। ফলে তাৎক্ষণিক ওই রোগী ভালো হলেও দীর্ঘমেয়াদে রোগীর ক্ষতি হয়ে যায়। তাদের চিকিৎসা পদ্ধতি এমন যে, একজন রোগীর চিকিৎসা প্রয়োজন ‘অ’ ক্যাটাগরির। কিন্তু ওই রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে ফেলেন ঈ বা উ এমনকি না বুঝে ত ক্যাটাগরি চিকিৎসাও দিয়ে ফেলেন। ফলে ওই রোগীর পরবর্তী সময়ে সরকারি হাসপাতাল বা একজন এফসিপিএস ডাক্তারের কাছে গেলেও সে রোগী আর ভালো হয় না। কারণ তার চিকিৎসা লেভেল পূর্বেই শেষ করে ফেলেছেন। কিন্তু বদনামটা হয় ওই বড় ডাক্তারদের। কিন্তু ডিসপেন্সারি ডাক্তার ক্ষতি করেও আড়ালেই থেকে যান। সুতরাং, এখানে কে কাকে দোষ দেবে? সুতরাং পুরো সমস্যার সমাধান টানতে হলে, ‘স্বাস্থ্য কার্ড’ নয়, সবার চিকিৎসাকেই সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। আপনি যদি কার্ড বিতরণ করেন সেই কার্ড বিতরণেও চলবে অনিয়ম। চিকিৎসা বিষয়টি মৌলিক, এটা সবারই সমানভাবে প্রাপ্য। চিকিৎসা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে পল্লী চিকিৎসার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ গ্রামে চিকিৎসা শুরু হয় পল্লী চিকিৎসকের হাত ধরে। পল্লী চিকিৎসকের কাছে রোগী ভালো হলে, বড় বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এমনিতেই কমবে। এখানে যে বিষয়টা লক্ষ করতে হবে, তাহলো পল্লী চিকিৎসক কখনোই ডিসপেন্সারি দিতে পরবে না। কারণ ডিসপেন্সারি দিলে তার মূল লক্ষ্য হবে ওষুধ বিক্রি করা, চিকিৎসা নয়।

ডিসপেন্সারি দিলে পল্লী চিকিৎসক নয়, পল্লী চিকিৎসক হলে ডিসপেন্সারি নয়। বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকেই। ডিসপেন্সারিতে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো প্রকার ওষুধ বিক্রি করা যাবে না। হোক সেটা প্যারাসিটামল। হাসপাতালে রোগী আসবে, এটাই স্বাভাবিক। সেটা যদি বেশি হয় বিপত্তিটা ঘটে তখনই। পুরো সিস্টেমটাই এলোমেলো হয়ে যায়, বেগ পেতে হয় হাসপাতাল

কর্র্তৃপক্ষকে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষেরও স্বাভাবিক কাজটিও অস্বাভাবিক হয়ে যায়। তাই হাসপাতালের অতিরিক্ত যে রোগীগুলো অর্থাৎ হাসপাতাল বেডে রেখে যাদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে না, তাদের আশপাশের প্রাইভেট হাসপাতালে রেফার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ওই রোগীর স্বাস্থ্য বীমার মাধ্যমে ব্যয় বহন করা যেতে পারে। যদিও বাংলাদেশের বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা তলানিতে। তাই এ বিষয়টি রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। তবেই হয়তো স্বাস্থ্য খাতে স্বস্তি ফিরবে। সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য বেগ পেতে হবে না। বড় বড় আমলাদের চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ বা অন্য কোনো দেশে যেতে হবে না। প্রত্যেকের চিকিৎসার নিশ্চয়তা প্রদান করবে রাষ্ট্র নিজেই।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত