কনস্টেবল হাবিবুর রহমান। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে টানা ৩৯ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে মানুষের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা আর পেশাগত শৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে। দীর্ঘ সেই পথচলা শেষে অবসরজনিত কারণে তাকে বিদায় জানানো হলো ব্যতিক্রমী আয়োজনে। সহকর্মীদের ভালোবাসায় ওসির সাজসজ্জা করা গাড়িতে চড়ে বাড়ি ফিরলেন এই প্রবীণ পুলিশ সদস্য।
হাবিবুর রহমান গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানার বামনডাঙ্গা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। এলাকাবাসীর কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন সৎ, নিরহংকার ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ হিসেবে। থানার ছোট-বড় সব কাজেই তার উপস্থিতি ছিল নির্ভরতার প্রতীক। রাতে টহল, ভোরের ডিউটি কিংবা উৎসবের নিরাপত্তা—কোনো দায়িত্বেই তিনি কখনো অবহেলা করেননি বলে সহকর্মীরা জানান।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে কনস্টেবল হাবিবুর রহমানকে বিদায় জানানো হয় ওসির গাড়িতে করে। বিদায়ের দিন তদন্ত কেন্দ্রের পরিবেশ ছিল আবেগঘন। সহকর্মীরা ফুল দিয়ে সাজান গাড়ি, গলায় পরিয়ে দেন সম্মাননার মালা। অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করা মানুষটি আর নিয়মিত ডিউটিতে আসবেন না—এই অনুভূতিই সবাইকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। পুলিশ সদস্যরা বলেন, হাবিবুর রহমান শুধু একজন সহকর্মী নন, অনেকের কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবকের মতো।
গাড়ি যখন তার বাড়ির পথে রওনা হয়, রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। পুলিশ সদস্যরা তাকে ফুল দিয়ে বিদায় অভ্যার্থনা জানান। কেউ কেউ মোবাইলে সেই মুহূর্ত ধারণ করেন। সাধারণ এক কনস্টেবলের এমন রাজকীয় বিদায় সুন্দরগঞ্জ থানা পুলিশের ব্যাপক প্রশংসা করেন। একজন পুলিশ সদস্যকে ওসির গাড়িতে করে বিদায় জানানো ইতিবাচক পরিবর্তন ভাবছেন সচেতন মহল।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, পুলিশের চাকরি সহজ ছিল না। ঈদ-পূজা, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা পরিবারের অসুখ—কিছুই দায়িত্বের আগে আসেনি। অনেক রাত নির্ঘুম কেটেছে, বহু উৎসব কেটেছে ডিউটিতে। তবু মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। অবসরের পর পরিবারকে সময় দেব, গ্রামের বাড়িতে শান্তভাবে বাকি জীবন কাটাতে চাই।
বামনডাঙ্গা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ আব্দুস সবুর বলেন, হাবিবুর রহমান ছিলেন দায়িত্বের প্রতি নিবেদিত একজন মানুষ। তার অভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতা পুরো তদন্ত কেন্দ্রকে শক্তি জুগিয়েছে। এমন সহকর্মী পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম বলেন, একজন সৎ ও অভিজ্ঞ সদস্যকে হারানো মানে বড় শূন্যতা। নতুনরা তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছে। শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা আর মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ—এই তিন গুণ তাকে আলাদা করেছে। এমন বিদায় পুরো বাহিনীর জন্যই গৌরবের।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন কঞ্চিবাড়ি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক সেলিম রেজা, থানার সেকেন্ড অফিসার মমিনুল ইসলাম, এসআই আলমগীর হোসেন, এএসআই মমিন ও মামুনুর রশিদসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা।
