শবে বরাত এলেই পুরান ঢাকা যেন নতুন রূপ ধারণ করে। শত বছরের ঐতিহ্য, ধর্মীয় আবেগ ও সামাজিক বন্ধনের মিলনে এই রাতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আলাদা এক সংস্কৃতি। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে নারিন্দা, লক্ষ্মীবাজার, আরমানিটোলা, চকবাজার, বংশাল, লালবাগ, গেণ্ডারিয়া ও সূত্রাপুরের অলিগলি আলোকসজ্জায় ঝলমল করতে থাকে। ঘরে ঘরে জ্বলে তারাবাতি, মোমবাতি ও আগরবাতি, আর বাতাসে ভেসে আসে গোলাপজলের সুঘ্রাণ।
শবে বরাতের আগের দিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, পুরান ঢাকার অলিগলিতে ব্যস্ততা তুঙ্গে ওঠে। নারিন্দা, আরমানিটোলা ও চকবাজার এলাকার প্রায় প্রতিটি মসজিদের সামনে তখন গরু নামানোর দৃশ্য চোখে পড়ে, কোথাও কোথাও চুলা বসিয়ে বড় ডেগে বিরিয়ানি রান্নার প্রস্তুতি চলতে থাকে। একই সময় পাড়া-মহল্লার মোড়ে মোড়ে কয়েকটি পরিবারকে একসঙ্গে বাজার করতে দেখা যায়, যারা পরে খাবার নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন।
খাবারের আয়োজন চোখে পড়ার মতো। চকবাজার, নাজিরাবাজার, কলতাবাজার ও বেগমগঞ্জের মোড়ে মোড়ে শামিয়ানা টাঙিয়ে অস্থায়ী দোকান বসেছে, যেখানে সারি সারি করে সাজানো বড় বড় নকশী রুটি, যাকে স্থানীয়রা ফেন্সি রুটি বলেন। দোকানের সামনে ভিড় করে মানুষ কিনছেন বুটের হালুয়া, গাজরের হালুয়া, সুজির হালুয়া ও সেমাই। ইসলামপুরে কথা হয় বাসিন্দা নূর মোহাম্মদের সঙ্গে। তিনি রুটি হাতে নিয়ে বলেন, এই রুটির সঙ্গে আমাদের শৈশবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে কিনতাম, এখন সন্তানদের নিয়ে আসি।
শিরমাল রুটিও পুরান ঢাকার শবে বরাতের ঐতিহ্যের অংশ। একসময় ভারত থেকে আসা হালুইকররা সবচেয়ে ভালো শিরমাল তৈরি করতেন। তন্দুরে রুটি বেক করার সময় তাতে দুধ ছিটিয়ে দেওয়া হতো, যা একে আলাদা স্বাদ দিত। আজও নারিন্দা, চকবাজার, রায়সাহেব বাজার ও বংশালের বড় বেকারিগুলো এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। বিশেষ করে সাতরওজার আনন্দ বেকারি, চকবাজারের বোম্বে সুইটস অ্যান্ড কাবাব, রায়সাহেব বাজারের ইউসুফ বেকারি ও বংশালের আল-রাজ্জাক কনফেকশনারির বিশেষ আয়োজন চোখে পড়ার মতো।
শবে বরাতের রাতে অনেকেই মৃত স্বজনদের কবর জিয়ারত করেন, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালান। কেউ কেউ আতর ব্যবহার করেন, চোখে সুরমা দেন এবং পরকালীন শান্তির প্রত্যাশায় এদিন ও পরদিন রোজা রাখেন। একসময় পুরান ঢাকার অলিগলিতে শিশু-কিশোরদের আতশবাজি ও পটকা ফোটানোর দৃশ্য দেখা গেলেও এখন তা অনেকটাই কমে গেছে।
লক্ষ্মীবাজারের প্রবীণ বাসিন্দা আবদুল খালেক বলেন, আগে আমরা ছোটবেলায় টিফিনের টাকা জমিয়ে বাজি কিনতাম। এখন সেই দৃশ্য আর খুব একটা দেখা যায় না।
রুটি কিনতে এসে পুরান ঢাকার বংশাল এলাকার জয়নাল মিয়া বলেন, শবে বরাতে নানা রকমের রুটি কেনা হয়। এটা আমাদের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে। এই রুটি, শিরমাল আর হালুয়ার গন্ধেই আমাদের শৈশব জড়িয়ে আছে। যতই সময় বদলাক, এই সংস্কৃতি বদলাবে না।
শবে বরাতের রাতে পুরান ঢাকার মসজিদগুলো সারারাত ইবাদতে মুখর থাকে। এশার নামাজের পর তবারক হিসেবে বিরিয়ানি বা সিন্নি বিতরণ করা হয়। অনেক পরিবারে পোলাও, ভুনা খিচুড়ি কিংবা কাচ্চি বিরিয়ানি রান্না হয়। রুটি, হালুয়া ও মাংস বড় বড় ট্রেতে সাজিয়ে প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠানো হয়। বিশেষ করে ছেলে বা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে বাহারি ডালায় করে রুটি-হালুয়া ও নতুন পোশাক পাঠানোর রেওয়াজ এখনো প্রচলিত।
সব মিলিয়ে শবে বরাত পুরান ঢাকার মানুষের কাছে শুধু একটি ধর্মীয় রাত নয়, বরং পারিবারিক বন্ধন, প্রতিবেশী সম্পর্ক ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মিলনমেলা।
আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এই এলাকার মানুষ এখনো নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের পুরোনো রীতিনীতি ধরে রেখেছে, যা পুরান ঢাকার শবে বরাতকে দেশের অন্য যেকোনো জায়গা থেকে আলাদা করে তোলে।
