টিউশনির টাকা বাঁচিয়ে এমপি প্রার্থী জেলের ছেলে 

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:১৭ পিএম

পরমানন্দ দাস (৩৫)। জীবনটা শুরু হয়েছিল একেবারে প্রান্তিক বাস্তবতায়। অজপাড়াগাঁয়ে বাবার সঙ্গে মাছ ধরে সংসারের চাকা ঘোরাতেন তিনি। সেই কাদামাখা জীবন থেকেই স্বপ্ন দেখেছেন বড় হওয়ার, মানুষের জন্য কিছু করার। অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। এলএলবি ও স্নাতকোত্তর শেষ করলেও কপালে জোটেনি কোনো চাকরি। পরে টিউশনি করেই সংসার চালাতে শুরু করেন। সেই টিউশনির টাকা একটু একটু করে জমিয়ে এবার সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দারিদ্র্যপীড়িত এই জেলের সন্তান। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল–মার্কসবাদী থেকে কাঁচি প্রতীক নিয়ে তিনি লড়ছেন হেভিওয়েট প্রার্থীদের বিপক্ষে।

‎‎পরমানন্দ দাস উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের পশ্চিম বাছহাটী গ্রামের রামচন্দ্র দাসের ছেলে। বাবা রামচন্দ্র পেশায় একজন জেলে। অভাবের সংসারে ছেলেকে পড়াশোনা করানো ছিল কঠিন এক লড়াই। তবু বাবা-মায়ের স্বপ্ন আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি গাইবান্ধা শহরের গোবিন্দপুর এলাকায় বসবাস করেন এবং সেখান থেকেই টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

‎‎ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ আসনটি ইতোমধ্যে রাজনৈতিকভাবে বেশ আলোচিত। এই আসনে হেভিওয়েট তিন প্রার্থীসহ মোট আটজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী লাঙল প্রতীক, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মাজেদুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীক এবং জেলা বিএনপির সহসভাপতি অধ্যাপক ডা. জিয়াউল ইসলাম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন। 

‎তাদের মতো প্রভাবশালী নেতাদের বিপরীতে একেবারে সাধারণ ঘরের সন্তান পরমানন্দ দাসের লড়াইকে ভিন্ন চোখে দেখছেন ভোটাররা।

‎সাধারণ ভোটাররা বলছেন, বড় দলের প্রার্থীদের ভিড়ে পরমানন্দ দাস একেবারেই আলাদা চরিত্র। তার প্রচারে নেই টাকার ঝনঝনানি, নেই দামি পোস্টার বা মাইকিংয়ের বাহুল্য। অনেকেই মনে করছেন, এমন সৎ ও স্বল্প আয়ের মানুষ সংসদে গেলে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর জোরালো হবে। 

‎এছাড়াও এ আসনে আমজনতার দলের কাওছর আজম হান্নু প্রজাপতি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রমজান আলী হাতপাখা, জাপার বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাফা মহসিন সরদার ঢেঁকি এবং ছালমা আক্তার শিল্পী কলস প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

‎‎এত প্রার্থীর ভিড়ে পরমানন্দের প্রচার একেবারেই সাদামাটা। নেই বিলাসী গাড়ি, নেই বড় কোনো প্রচার দল। একটা পুরনো স্কুটিতে চড়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভোট চাইছেন তিনি। ডিজিটাল প্রচার, কর্মী সমর্থক কিংবা পথসভার বিশাল আয়োজন ছাড়াই ভোট প্রার্থনায় নিরলস ছুটছেন এ প্রার্থী। যেখানে অন্যসব দলে হেভিওয়েটরা বিশাল গাড়ি বহর আর হাজারো কর্মী সমর্থক নিয়ে মিছিল মিটিংয়ে ব্যস্ত সেখানে বৈপরীত্যে পরমানন্দ দাস।

‎নির্বাচনী হলফনামা ঘেঁটে দেখা যায়, পরমানন্দ দাস নিজের একমাত্র আয়ের উৎস হিসেবে টিউশনির কথা উল্লেখ করেছেন। তার কাছে জমানো নগদ অর্থ রয়েছে ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা। আসবাবপত্র আছে ৪০ হাজার টাকার এবং টিভি, ফ্রিজ ও ফ্যানসহ ইলেকট্রনিক সামগ্রীর মূল্য দেখিয়েছেন ৮০ হাজার টাকা। এর বাইরে তার নামে কোনো জমি, বাড়ি বা অন্য কোনো সম্পদ নেই। নির্বাচনে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

‎নির্বাচনী খরচ জোগাতে পরিবারের সদস্যরাও পাশে দাঁড়িয়েছেন। হলফনামা অনুযায়ী, তার শ্বশুর অতুল চন্দ্র দিয়েছেন ৩০ হাজার টাকা এবং ভগ্নীপতি সরকারি চাকরিজীবী হরিশ্চন্দ্র দিয়েছেন ৫০ হাজার টাকা। দলের পক্ষ থেকে গণচাঁদা হিসেবে পেয়েছেন ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এত সীমিত সামর্থ্য নিয়েও তিনি নির্বাচনী মাঠ ছাড়তে রাজি নন। 

‎পরমানন্দ দাস বলেন, রাজনীতি শুধু টাকার খেলা নয়, মানুষের বিশ্বাসের জায়গা। সাধারণ মানুষ যদি সুযোগ পায়, তারাও নেতৃত্ব দিতে পারে। আমি সেই বিশ্বাস থেকেই ভোটে দাঁড়িয়েছি। জয়-পরাজয় বড় কথা নয়, মানুষের অধিকারের কথা বলাই আমার লক্ষ্য।

‎‎তিনি আরও বলেন, বড় বড় প্রার্থীর বিপক্ষে লড়াই কঠিন, তবু ভয় পাই না। আমার ভরসা সাধারণ মানুষ। টিউশনির টাকায় নির্বাচন করছি, বিলাসী প্রচারণা করার সামর্থ্য নেই। কিন্তু সততা আর আদর্শ আছে, সেটাই আমার শক্তি।

‎‎এ আসনে ১২৩টি ভোটকেন্দ্রে ৭৬৯টি কক্ষে মোট ৪ লাখ ১৯ হাজার ১১১ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭ হাজার ৫৭৪, নারী ভোটার ২ লাখ ১১ হাজার ৫৩৪ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৩ জন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত