ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনে বিএনপি আত্মবিশ্বাসী বলে জানিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।
মাহদী আমিন বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার দুটি নির্বাচনী আসন বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭-তে ইতিমধ্যে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি বলেন, বুধবার রাত থেকে আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিভিন্ন ধরনের কারচুপি, জালিয়াতি, কেন্দ্র দখলসহ নানা অপরাধে সম্পৃক্ত ছিল। তারপরও জনগণের আন্তরিক ভালোবাসা ও সমর্থনে আমরা দেখেছি, ধানের শীষের প্রার্থীরা বিপুলসংখ্যক আসনে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। অনেকেই এরই মধ্যে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত বিএনপি ইনশাআল্লাহ জনসমর্থন নিয়ে, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ভোটের হিসাব ও আসনভিত্তিক বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে, এ বিজয় নিয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী।
তিনি বলেন, আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন, নির্বাচনের দিনও (বৃহস্পতিবার) দেশ জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় অনেক ধরনের কারচুপি, জালিয়াতি এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষভাবে, নির্দিষ্ট কিছু আসনে নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনার জন্য ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। এটি বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যদি উদাহরণ দিই, শুধু ঢাকা শহরে ঢাকা-৮, ঢাকা-১১, ঢাকা-১৩, ঢাকা-১৬সহ বেশ কিছু আসনে ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিলম্ব করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র বলেন, বিএনপির কিংবা ধানের শীষের বিপুল ব্যবধানে অপ্রতিরোধ্য যে বিজয়, সেই বিজয়ের ব্যবধানটা কমিয়ে আনার জন্য একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল অপপ্রচার এবং নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন করেছে। ফলে নির্দিষ্ট কিছু আসনে এই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়তো পরাজয়ের ব্যবধানটা কমিয়ে আনছে এবং দেশব্যাপী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কিছুটা ব্যাহত করেছে।
গণতন্ত্রকামী মানুষ যে উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, বিজয়ী করেছেন, এজন্য তাদের আন্তরিকভাবে শুভেচ্ছা জানান মাহদী আমিন। এর আগে ভোটগ্রহণ শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার গুলশানে নির্বাচনী কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন করায় নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী, অন্তর্বর্তী সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ নির্বাচন পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানানো হয়।
তার আগে সকালে ভোট দেওয়া শেষে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘ভোট সুষ্ঠু হলে ফল মেনে নেওয়া হবে। জনগণ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট প্রদানে অংশগ্রহণ করতে পারলে এটি দেশের গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে ভোট নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলে ফল গ্রহণযোগ্য হবে না।’
নেতাকর্মীদের সজাগ থাকার আহ্বান : বিকেলে গুলশানে নির্বাচনী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ‘বিএনপির বিজয় অনিবার্য ও অবশ্যম্ভাবী।’ তিনি বলেন, দেশের জনগণ যে আবেগ ও আকাক্সক্ষা নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে জনগণের ম্যান্ডেটে নির্বাচিত সরকার সেটি আন্তরিকভাবে প্রতিপালন করবে।
পরিবারসহ ভোট দিলেন তারেক রহমান : সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ঢাকা-১৭ আসনে অবস্থিত গুলশান মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে পরিবারসহ ভোট দেন তারেক রহমান। তিনি এ আসনে বিএনপির প্রার্থীও। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিএনপি জয়ের ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে আশাবাদী বলেও জানান। তিনি বলেন, ‘বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষ এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিল। আশা করি, দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা করবে।’
সারা দেশ থেকে গত রাতে পাওয়া কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোরভাবে সেসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, যা আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয়েছে।’ ভোটার ও দলীয় নেতাকর্মীদের শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে অবস্থান করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ যদি সারাদিন ভোটকেন্দ্রে এসে তাদের অধিকার প্রয়োগ করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া সম্ভব।’
নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘তিনি এবং তার দল জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’ সম্ভাব্য সরকার গঠনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষ যাতে দেশে নিরাপদ বোধ করেন, সেটিই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের পিছিয়ে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী নারীর মূল্যায়ন ও ক্ষমতায়নের কাজ প্রথম দিন থেকেই শুরু করা হবে।’ ভোটের পরিবেশ কেমন দেখছেন বা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। আরও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর হয়তো বলতে পারব।’ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুন্দর ও স্থিতিশীল আগামীর প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।
গুলশান কার্যালয়ে তারেক রহমান : সকালে ভোট প্রদান শেষে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবস্থান নেন তারেক রহমান। সেখানে বসে সারা দেশে নির্বাচনের খোঁজখবর নেন তিনি। প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারপারসন ওই কার্যালয়ে বসে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, নিজ আসন ঢাকা-১৭-এর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আব্দুস সালামসহ সংশ্লিষ্ট সব নেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং টেলিভিশনে চোখ রাখেন।
রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন : এরপর একাই বের হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। প্রথমে মহাখালী এলাকার একটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। পরে পর্যায়ক্রমে সাততলা বস্তি, করাইল বস্তি, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, মিরপুর ডিওএইচএস, মিরপুর-১৪, ভাসানটেক, মিরপুর-১০, টেকনিক্যাল এলাকা, ধানম-ি-২৭, ধানম-ি-৩২ ও কারওয়ান বাজার হয়ে গুলশান এলাকার কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখেন।
পরিদর্শনকালে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত পোলিং এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ভোটগ্রহণের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। পাশাপাশি উপস্থিত সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন। হঠাৎ তাকে কাছে পেয়ে অনেক ভোটার আবেগে আপ্লুত হন। অনেকে তার সঙ্গে ছবি তোলেন। কেন্দ্রগুলো ঘুরে তিনি ভোটের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় দলীয় নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে ছিলেন।
ভোট নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলে ফল গ্রহণযোগ্য হবে না : দুপুরে রাজধানীর কয়েকটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে গুলশানে দলের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপি চেয়ারম্যান সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘ভোট সুষ্ঠু হলে ফল মেনে নেওয়া হবে। জনগণ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট প্রদানে অংশগ্রহণ করতে পারলে এটি দেশের গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে ভোট নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলে ফল গ্রহণযোগ্য হবে না।’
এ বিষয়ে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘ভোটাররা যাতে তাদের ভোটের ফল দ্রুত পায়, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচেষ্ট থাকবে।’ ভোটে জয়ী হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ভোটে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। আশা করি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শান্তিপূর্ণভাবে ভোট প্রদানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করবে।’
জয়ের পর বিএনপির প্রধান লক্ষ্য জানতে চাইলে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। সাধারণ মানুষ যেন দেশের যেকোনো প্রান্তে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে, সেটিই মূল কাজ হবে।’
উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান : সকালে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে তারেক রহমান নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। এতে গণতন্ত্রকামী দেশবাসীকে উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান।
