গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, শুরু থেকে আমরা একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম। সেই প্রতিশ্রুতিতে এখনো অটল। আমরা সামগ্রিক ফলকে স্বীকৃতি দিচ্ছি এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। গতকাল শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২ আসনে জয়লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। ৭৭ আসন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। নির্বাচনের ভোট গণনায় অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে অন্তত ৩০টি আসনে ফল পুনর্গণনার আবেদন করেছে এই জোট। এ নিয়ে জামায়াতের তৃণমূল থেকে আন্দোলনে যাওয়ার চাপ থাকার পরও দলের আমিরের এমন ঘোষণা শান্তির রাজনীতির বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পোস্টে সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শফিকুর রহমান বলেন, বিগত মাসগুলোতে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, সেই অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। অনেকে নিজের সময়, শক্তি ও বিশ্বাস উৎসর্গ করেছেন। অনেকে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আপনাদের এই সাহসিকতা আমাদের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে।
দল ও জোটের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি জানি, আপনাদের মধ্যে অনেকে আজ ব্যথিত এবং গভীরভাবে হতাশ। এটা স্বাভাবিক। যখন আপনি কোনো আদর্শের পেছনে হৃদয় ঢেলে দেন, তখন তার ফল আপনাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই, আপনাদের প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি। ৭৭টি আসন নিয়ে সংসদে আমাদের উপস্থিতিকে প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি করেছি এবং আধুনিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী ব্লকে পরিণত হয়েছি।’
জামায়াত আমির লেখেন, ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাজনীতির ভাগ্য পরিবর্তনশীল। ২০০৮ সালে বিএনপি মাত্র ৩০টি আসনে নেমে এসেছিল, যেখান থেকে দীর্ঘ ১৮ বছরের পথ পাড়ি দিয়ে ২০২৬ সালে তারা সরকার গঠন করেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতি একটি দীর্ঘ পথ। আমাদের পথ এখন পরিষ্কার, মানুষের আস্থা অর্জন, ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দায়িত্বশীলভাবে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
গণতান্ত্রিক রীতি ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জামায়াত আমির আরও লেখেন, যেকোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা শুধু নির্বাচনী প্রচারণায় নয়, বরং জনগণের রায়কে কীভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে। আমাদের আন্দোলন কখনোই শুধু একটি নির্বাচনের জন্য ছিল না। এটি ছিল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করা, নাগরিকদের অধিকার রক্ষা এবং একটি ন্যায়বিচারপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা হচ্ছে। আমরা নীতিবান, দায়িত্বশীল এবং শান্তিপূর্ণ বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করব; একই সঙ্গে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করে জাতীয় অগ্রগতিতে গঠনমূলক অবদান রাখব। নীতিভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনীতির প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অবিচল থাকবে।
৩০ আসনে কারচুপির অভিযোগ, আইনি পদক্ষেপে জামায়াত : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৩০টি আসনে ব্যাপক কারচুপি, জালিয়াতি ও অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এসব আসনে পুনর্গণনা ও ফল স্থগিতের দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছে এবং প্রয়োজনে সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের এই মুখপাত্র এ সব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতা ও আইনজীবী প্যানেলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, দেশের মানুষ একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন প্রত্যাশা করেছিল। নির্বাচন সম্পন্ন হলেও বহু স্থানে এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, ভোট গণনায় গরমিল, ফল ঘোষণায় অস্বাভাবিক বিলম্ব ও পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিছু আসনে ভোর পাঁচটার দিকে ফল দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও দ্রুত ফল ঘোষণা করা হয়েছে যা সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
তিনি জানান, যেসব আসনে পাঁচ হাজার থেকে দশ হাজার ভোটের ব্যবধানে ফল হয়েছে, সেসব জায়গায় অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে দলটি। স্থানীয় রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা-৬ আসনের প্রার্থী ডা. আব্দুল মান্নান কয়েকটি কেন্দ্রের ফলের কপি দেখিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, কিছু কেন্দ্রে প্রিন্টেড ফলের বদলে হাতে লেখা কাগজ দেওয়া হয়েছে, কোথাও পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর নেই, আবার কোথাও অচেনা ব্যক্তির নাম এজেন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি একটি কেন্দ্রে পেন্সিল দিয়ে ফল লেখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নির্বাচনের রাতেই ফল স্থগিতের আবেদন করা হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
জুবায়ের আরও বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। হামলা, মারধর, বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে। কিছু স্থানে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে সহিংসতামুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সর্বাধিক আসন পাওয়া দলের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, পুনর্গণনা হলে প্রকৃত ফল বেরিয়ে আসবে এবং যাদের পরাজিত দেখানো হয়েছে, তাদের অনেকেই বিজয়ী হবেন বলে বিশ্বাস করব। নির্বাচন কমিশনকে সংশ্লিষ্ট আসনগুলোর ফল স্থগিত রেখে পুনর্গণনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
ভোট পুনর্গণনার জন্য আবেদন করা আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঢাকা-৭, ঢাকা-৮, ঢাকা-১০ , ঢাকা-১৩, ঢাকা-১৭, পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-৩, দিনাজপুর-৫, লালমনিরহাট-১, লালমনিরহাট-২, গাইবান্ধা-৪, বগুড়া-৩, সিরাজগঞ্জ-১, যশোর-৩, খুলনা-৩, খুলনা-৫,বরগুনা-২, ঝালকাঠি-১, পিরোজপুর-২, ময়মনসিংহ-১, ময়মনসিংহ-৪, ময়মনসিংহ-১০, কিশোরগঞ্জ-৩, , গোপালগঞ্জ-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, চাঁদপুর-৪, চট্টগ্রাম-১৪, কক্সবাজার-৪।
মিরপুরে নিজ হাতে ফেস্টুন অপসারণ করলেন : দেশব্যাপী জুলুম-অত্যাচার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমার কর্মীর গায়ে নয়, পারলে আমার গায়ে হাত দাও। এখনই দেশব্যাপী সব জুলুম-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।’
গতকাল শনিবার রাতে তার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ আসনের বিভিন্ন এলাকা সফর করেন। ওই এলাকার মসজিদে আসর ও মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। এ সময় তিনি সাধারণ মুসল্লি ও জনগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং কুশল বিনিময় করেন। ঢাকা-১৫ আসনের উন্নয়নসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে যে ওয়াদা করেছেন তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। এ সময় তিনি জনগণের সমস্যার কথা জানার ও বোঝার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, ‘জনগণ আমাদের ওপর যতটুকু দায়িত্ব দিয়েছে, সর্বোচ্চ দিয়ে তা পালন করব। দেশটা কারও কাছে ইজারা দেব না, কাউকে প্রভু মানব না, কারও দাসত্ব স্বীকার করব না।’
মতবিনিময়ের আগে জামায়াত আমির নিজের নির্বাচনী এলাকার কিছু বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন নিজ হাতে অপসারণ করেন। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুসরণ করে সব বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন অপসারণের আহ্বান জানিয়ে তিনি সংগঠনের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে এবং জনগণের সমস্যা সমাধানে আমাদের সবাইকে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
