নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রা শুরু

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৬ এএম

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালন শেষে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ১৭ বছর পর দেশে অনুষ্ঠিত উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনর্গঠনের পথ খুলে দিয়েছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্মিলিতভাবে একটি প্রশংসনীয় নজির সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত এ নির্বাচন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে। গতকাল সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করে।

ভাষণের শুরুতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নির্বাচন সফল হয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে। এ নির্বাচন শুধু একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা; নতুন বাংলাদেশের জন্ম। এ অর্জনের পেছনে জুলাইয়ে রাস্তায় নেমে আসা প্রতিবাদকারী তরুণ-তরুণীরা। সেই সাহসী মানুষগুলো যারা শহীদ কিংবা আহত হয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তাদের অভূতপূর্ব ত্যাগ ছাড়া এ পরিবর্তন সম্ভব হতো না। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে জয়ী এবং পরাজিত সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যারা জয়ী হতে পারেননি, তারা এই জেনে আশ্বস্ত হবেন যে, প্রায় অর্ধেক ভোটার আপনাদের ওপর আস্থা রেখেছে।

ড. ইউনূস বলেন, ‘বিগত ১৮ মাস আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন শেষে, একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আজ আমি আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছি।’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টকে ‘মহা মুক্তির দিন’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশিরা দেশে-বিদেশে যে যেখানে ছিল, আনন্দে চোখের পানি ফেলেছিল। দৈত্যের গ্রাস থেকে তরুণ ছাত্রছাত্রীরা দেশকে বের করে এনেছে। দেশ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু দেশ সম্পূর্ণ অচল। অচল এ দেশটিকে কীভাবে সচল করা যাবে সেটা ছিল সবার মনে। প্রশাসনের শীর্ষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি ও আস্থাহীনতার কারণে রাষ্ট্রযন্ত্র সচল করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান পান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছাত্রনেতাদের অনুরোধে জাতির প্রতি কর্তব্যবোধ থেকেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সেই দায়িত্ব শেষ করে বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে।

তিন অগ্রাধিকার (সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন) : ড. ইউনূস বলেন, ‘আমাদের প্রথম কাজ ছিল দেশকে সচল করা। এটা ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। যারা দেশকে লুটেপুটে খেত তারাই দেশের এ যন্ত্র চালাত। তাদের একান্ত অনুগত লোক নিয়ে অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সবাই পালিয়েছে। বড় কর্তা পালিয়েছে। মাঝারি কর্তা পালিয়েছে। অন্যরা ভোল পাল্টিয়েছে। অথবা আত্মগোপনে চলে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে ছিল। রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছিল। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিনটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। সরকার প্রায় ১৩০টি আইন ও সংশোধনী এবং প্রায় ৬০০ নির্বাহী আদেশ জারি করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর বড় অংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব পদক্ষেপ নাগরিক অধিকার সংহত করা, বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধ করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তন : দায়িত্ব গ্রহণের সময় থানাগুলো পুলিশশূন্য ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধাপে ধাপে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এখন পুলিশকে জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয়, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে সংস্কারের কথা তুলে ধরেন তিনি। গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনের বিষয়টিও উল্লেখ করেন।

জুলাই সনদ ও গণভোট : অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ‘জুলাই সনদ’-এর কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, গণভোটে বিপুল সমর্থনের মাধ্যমে এ সনদ বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়েছে। এটি কার্যকর হলে স্বৈরতন্ত্র ফিরে আসার পথ বন্ধ হবে। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতের বিষয়টিকে নির্বাচন ব্যবস্থার একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

মাইনাস থেকে শুরু : অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি, শুরু করেছি মাইনাস থেকে। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে তারপর সংস্কারের পথ ধরেছি। আজ অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্র, জবাবদিহি, বাকস্বাধীনতা ও অধিকার চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে, তা যেন কখনো থেমে না যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের জন্য এ দরজা খুলে দিয়েছে, আমরা যদি স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা ও শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, বিপুল অর্থ পাচার এবং ঋণের বোঝা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণ, শ্রম আইনে সংস্কার এবং প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতির ওপর একটি গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে। দুঃখজনকভাবে, দীর্ঘ সময় ধরে এ সংকট নিরসনে কোনো কার্যকর ও সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ দৃশ্যমান ছিল না। দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মৃতপ্রায় এ ইস্যুটিকে পুনরায় বিশ্ব মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। এ সংকটের গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতিসংঘ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য : পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুনরায় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ফলে শুল্কহার কমার বিষয়টি দেশের রপ্তানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় জাপান ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন : দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও আধুনিকীকরণের বিষয়টি পরিকল্পিতভাবে উপেক্ষিত ছিল বলে মন্তব্য করেন প্রধান উপদেষ্টা। বলেন, ‘আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই সেই অবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পেরেছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বর্তমান সরকার সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং যেকোনো ধরনের আগ্রাসন কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে উপযোগী করে গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার সীমিত মেয়াদের মধ্যে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।’

নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন : ভাষণের শেষাংশে অধ্যাপক ইউনূস তরুণদের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশ এখন আর শুধু সংকট থেকে উত্তরণের গল্প নয়। বাংলাদেশ আজ অমিত সম্ভাবনার দেশ। আমাদের ছেলেমেয়েরা অসীম সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়। এটি সাহসী, সৃজনশীল, উদ্যমী তরুণদের দেশ। তাদের দরকার উপযুক্ত শিক্ষা, বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ এবং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে মেধা ও পরিশ্রম ও সততার মূল্য আছে। সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালনায় প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক দক্ষ, কর্মঠ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মীর প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। আর বাংলাদেশে আছে কর্মক্ষম বিপুল তরুণ সম্প্রদায়। আমরা যদি এ বৈশ্বিক চাহিদা পূরণে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করি, তাহলে জাপান, কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ সবাই চাইবে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের শ্রম, মেধা ও সৃজনশীলতা ব্যবহার করতে। আমরা হয়ে উঠতে পারি তাদের জন্য পছন্দের একটি নির্ভরযোগ্য দক্ষ জনশক্তি সরবরাহকারী দেশ। দক্ষতা, শিক্ষা ও সততার ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করে ড. ইউনূস বলেন, তাদের আত্মত্যাগ জাতিকে পথ দেখাবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনকে ‘জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে গড়ে তোলার কথাও জানান।

ঐক্যের আহ্বান: বিদায়ী মুহূর্তে প্রধান উপদেষ্টা দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা ও জবাবদিহির যে চর্চা শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রাখার দায়িত্ব জনগণের ওপরই বর্তায় বলে উল্লেখ করেন। বলেন, জনগণের ঐক্য ও সচেতনতা থাকলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আর থামানো যাবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত